আজ ব্রাজিলের যে ১০টি শিল্প খাত বাংলাদেশি পণ্যের তীব্র চাহিদা অনুভব করছে
কেন ব্রাজিল এবং কেন এখন?
মোঃ জয়নাল আব্দীন
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (T&IB)
নির্বাহী পরিচালক, অনলাইন ট্রেনিং একাডেমি (OTA)
মহাসচিব, ব্রাজিল–বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (BBCCI)
ব্রাজিল শুধু লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি নয়; এটি একটি বিশাল ও বহুমুখী ভোক্তা ও শিল্পবাজার, যেখানে খুচরা বিক্রেতা, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, কৃষি-ব্যবসা এবং জনস্বাস্থ্য সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে নির্ভরযোগ্য আমদানিকৃত পণ্যের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশি রপ্তানিকারক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্রাজিল এমন একটি বাজার যেখানে একসাথে তিনটি বিষয় বিদ্যমান—বৃহৎ পরিমাণ চাহিদা, উন্নত বিতরণ নেটওয়ার্ক এবং কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন উৎস থেকে পণ্য সংগ্রহের আগ্রহ।
বাণিজ্য পরিসংখ্যান ইতোমধ্যেই দেখায় যে বাংলাদেশ ব্রাজিলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী, বিশেষ করে কিছু নির্দিষ্ট খাতে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে ব্রাজিলের টেক্সটাইল আমদানির শীর্ষ উৎসগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ছিল, যেখানে বাংলাদেশের টেক্সটাইল রপ্তানির পরিমাণ কয়েকশ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। সামগ্রিক হিসাবেও দেখা যায়, ২০২৪ সালে ব্রাজিল বাংলাদেশ থেকে প্রায় কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এছাড়া সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে (জুলাই–জুন) ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এখন মূল সুযোগটি হলো “কিছু বাণিজ্য” থেকে “কৌশলগত খাতভিত্তিক অবস্থান”-এ রূপান্তর করা; অর্থাৎ, ব্রাজিলের কোন শিল্প খাতগুলো বড় পরিসরে কী ধরনের পণ্য আমদানি করে তা নির্ধারণ করা এবং সেই চাহিদার সাথে বাংলাদেশের শক্তিশালী উৎপাদন সক্ষমতাকে সরাসরি যুক্ত করা।
ব্রাজিলে “শিল্প খাতের চাহিদা” বলতে কী বোঝায়?
যখন বলা হয় কোনো ব্রাজিলীয় শিল্প খাতের আমদানিকৃত পণ্যের প্রয়োজন রয়েছে, সাধারণত এর পেছনে এক বা একাধিক বাস্তব কারণ কাজ করে।
প্রথমত, দেশীয় উৎপাদন পর্যাপ্ত নয় বা প্রয়োজনীয় মানের তুলনায় ব্যয় বেশি।
দ্বিতীয়ত, খুচরা বিক্রেতাদের বড় আকারে পণ্য সরবরাহ, দ্রুত পুনরায় সরবরাহ এবং স্থিতিশীল মূল্য দরকার।
তৃতীয়ত, টেকসইতা, স্বাস্থ্য বা ট্রেসেবিলিটি সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রক ও ভোক্তা পরিবর্তন কাঁচামাল ও পণ্যের ধরন বদলে দিচ্ছে।
চতুর্থত, একটি মাত্র সরবরাহকারী দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও স্থিতিশীল করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের শক্তি শুধু কম খরচে উৎপাদন নয়; বরং বৃহৎ পরিসরের উৎপাদন সক্ষমতা, টেক্সটাইল ও পোশাক খাতে বৈশ্বিক মানসম্পন্ন কমপ্লায়েন্স, ফার্মাসিউটিক্যাল, লেদার ও ফুটওয়্যার, পাটভিত্তিক টেকসই পণ্য এবং প্যাকেজিং, প্লাস্টিক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও ভোক্তা পণ্যের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা।
১) ফ্যাশন রিটেইল ও পোশাক শিল্প
ব্রাজিলের পোশাক বাজার বিশাল, মৌসুমি এবং ট্রেন্ডনির্ভর হলেও মূল্য-সংবেদনশীল বেসিক পণ্যের জন্য এটি এখনও ব্যাপকভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী পরিচিত বৃহৎ পরিসরে নিট ও ওভেন বেসিক, ইউনিফর্ম প্রোগ্রাম, ডেনিম ও ভ্যালু ডেনিম, লিঞ্জারি বেসিক এবং প্রাইভেট-লেবেল উৎপাদনের জন্য।
ব্রাজিলের প্রধান চাহিদা হলো নিয়মিত মানসম্পন্ন বেসিক পোশাক, দ্রুত বিক্রিত প্রয়োজনীয় আইটেম, স্কুল ও শিল্প ইউনিফর্ম, ডেনিম প্রোগ্রাম এবং ক্রমবর্ধমানভাবে “সাসটেইনেবল কটন” ও রিসাইকেল ফাইবারভিত্তিক পণ্য।
বাংলাদেশের উপযোগী পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে টি-শার্ট, পোলো শার্ট, আন্ডারওয়্যার, ক্যাজুয়াল বটম, ডেনিম, ওয়ার্কওয়্যার, ইউনিফর্ম, শিশুদের পোশাক ও প্রাইভেট-লেবেল কালেকশন।
এই খাতটি “আজকের সুযোগ” কারণ বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ২০২৪ সালে ব্রাজিলের শীর্ষ টেক্সটাইল সরবরাহকারীদের একটি, যা ক্রেতাদের গ্রহণযোগ্যতা ও সক্রিয় চাহিদা প্রমাণ করে।
২) হোম টেক্সটাইল ও সফট হোম (রিটেইল ও হসপিটালিটি)
ব্রাজিলের আবাসন বাজার, হোটেল-রিসোর্ট ও আধুনিক রিটেইল খাতে তোয়ালে, বেডশিট, কিচেন টেক্সটাইল, পর্দা, কম্বল ও ডেকোরেটিভ টেক্সটাইলের স্থায়ী চাহিদা রয়েছে। দেশীয় উৎপাদন থাকলেও মূল্য, ডিজাইন বৈচিত্র্য ও প্রাইভেট-লেবেলের কারণে আমদানির প্রয়োজন বজায় থাকে।
ব্রাজিলের চাহিদা হলো মিড ও প্রিমিয়াম তোয়ালে, হোটেল-গ্রেড বেড লিনেন, কিচেন ও বাথ সেট, মাইক্রোফাইবার ক্লিনিং টেক্সটাইল এবং মৌসুমি রিটেইল কালেকশন।
বাংলাদেশের উপযোগী পণ্য টেরি তোয়ালে, বাথরোব, বেডশিট, পিলোকভার, কমফর্টার (কমপ্লায়েন্স অনুযায়ী), কিচেন লিনেন ও ভ্যালু-অ্যাডেড হোম ডেকোর টেক্সটাইল।
৩) ফুটওয়্যার, লেদার গুডস ও ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজ
ব্রাজিল নিজেই একটি বড় ফুটওয়্যার উৎপাদক হলেও মূল্যনির্ভর ও ফ্যাশনভিত্তিক কিছু ক্যাটাগরিতে এটি আমদানিনির্ভর। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, ব্রাজিলে ফুটওয়্যার আমদানির প্রবণতা বাড়ছে, যা চলমান চাহিদার ইঙ্গিত দেয়।
ব্রাজিলের চাহিদা প্রতিযোগিতামূলক ফুটওয়্যার লাইন, লেদার গুডস, বেল্ট, ওয়ালেট, হ্যান্ডব্যাগ ও ট্রাভেল অ্যাকসেসরিজ।
বাংলাদেশের উপযোগী পণ্য লেদার জুতা (নির্বাচিত ক্যাটাগরি), স্যান্ডেল, লেদার ব্যাগ, ওয়ালেট, বেল্ট, সিনথেটিক ফ্যাশন ব্যাগ ও ট্রাভেল গুডস।
৪) টেকসই প্যাকেজিং শিল্প (পাট ও প্রাকৃতিক ফাইবার)
ব্রাজিলের কৃষি-ব্যবসা, রিটেইল ও রপ্তানি সরবরাহ শৃঙ্খলে প্লাস্টিক কমানোর চাপ বাড়ছে, ফলে প্রাকৃতিক ফাইবারভিত্তিক প্যাকেজিংয়ের চাহিদা বাড়ছে।
ব্রাজিলের চাহিদা ইকো-ফ্রেন্ডলি শপিং ব্যাগ, প্রোমোশনাল ব্যাগ ও কিছু শিল্প ও কৃষিভিত্তিক স্যাক।
বাংলাদেশের উপযোগী পণ্য পাটের শপিং ব্যাগ, প্রোমোশনাল ব্যাগ, পাটের স্যাক ও প্রাকৃতিক ফাইবারভিত্তিক প্যাকেজিং সমাধান।

৫) কৃষি-ব্যবসা ও বাল্ক হ্যান্ডলিং উপকরণ
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কৃষিপণ্য উৎপাদক দেশ হিসেবে ব্রাজিলে অভ্যন্তরীণ পরিবহন ও রপ্তানির জন্য বিপুল পরিমাণ প্যাকেজিং উপকরণের প্রয়োজন হয়।
ব্রাজিলের চাহিদা বাল্ক স্যাক, কভারিং, দড়ি ও টুইন।
বাংলাদেশের উপযোগী পণ্য পাটভিত্তিক শিল্প স্যাক, বোনা প্যাকেজিং সমাধান ও কৃষিভিত্তিক সহায়ক পণ্য।
৬) নির্মাণ ও অবকাঠামো শিল্প (টেকনিক্যাল টেক্সটাইল)
ব্রাজিলে সড়ক, ড্রেনেজ ও পানি ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত বিনিয়োগ হয়, যেখানে জিওটেক্সটাইল ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইল ব্যবহৃত হয়।
ব্রাজিলের চাহিদা দামসাশ্রয়ী কিন্তু মানসম্পন্ন টেকনিক্যাল টেক্সটাইল।
বাংলাদেশের উপযোগী পণ্য নির্বাচিত টেকনিক্যাল টেক্সটাইল ও প্রাকৃতিক ফাইবারভিত্তিক ইরোশন কন্ট্রোল সমাধান।
৭) ফার্মাসিউটিক্যাল ও হেলথকেয়ার পণ্য
ব্রাজিলের স্বাস্থ্যখাত লাতিন আমেরিকার বৃহত্তমগুলোর একটি, যেখানে জেনেরিক ও ওটিসি ওষুধের বড় বাজার রয়েছে।
ব্রাজিলের চাহিদা উচ্চমানের কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের জেনেরিক ওষুধ ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ।
বাংলাদেশের উপযোগী পণ্য নির্বাচিত ফিনিশড ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য ও এপিআই, যথাযথ নিয়ন্ত্রক অনুমোদন সাপেক্ষে।
৮) এফএমসিজি ও হাউসহোল্ড কনজ্যুমার গুডস
ব্রাজিলের আধুনিক রিটেইল খাতে রান্নাঘরের সামগ্রী, স্টোরেজ পণ্য ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
ব্রাজিলের চাহিদা প্রাইভেট-লেবেল ও ভ্যালু-ড্রিভেন হাউসহোল্ড পণ্য।
বাংলাদেশের উপযোগী পণ্য নির্বাচিত প্লাস্টিক পণ্য, মেলামাইন ও ক্লিনিং অ্যাকসেসরিজ।
৯) ফার্নিচার, হোম ডেকোর ও হস্তশিল্প
ব্রাজিলের লাইফস্টাইল রিটেইলে ডেকোরেটিভ পণ্য ও প্রাকৃতিক ফাইবারভিত্তিক হস্তশিল্পের চাহিদা বাড়ছে।
ব্রাজিলের চাহিদা ডিফারেনশিয়েটেড ডেকোর কালেকশন ও টেকসই লাইফস্টাইল পণ্য।
বাংলাদেশের উপযোগী পণ্য পাটের ম্যাট, বাস্কেট, আর্টিজান ডেকোর ও ছোট কাঠের সামগ্রী।
১০) আইসিটি, ডিজিটাল সার্ভিস ও বিজনেস আউটসোর্সিং
সব পণ্যই যে ভৌত হতে হবে তা নয়। ব্রাজিলের অনেক প্রতিষ্ঠান সফটওয়্যার, ডিজিটাল মার্কেটিং ও আউটসোর্সিং সেবা নিচ্ছে।
ব্রাজিলের চাহিদা খরচ-সাশ্রয়ী সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং ও ব্যাক-অফিস সাপোর্ট।
বাংলাদেশের উপযোগী সেবা সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব ও ই-কমার্স সাপোর্ট এবং ডিজিটাল কনটেন্ট সেবা।
পরবর্তী করণীয়: সুযোগকে চুক্তিতে রূপান্তর
এই সুযোগগুলোকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দিতে রপ্তানিকারক ও বিনিয়োগকারীদের খাতভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। নির্দিষ্ট ক্রেতা শ্রেণি চিহ্নিত করা, ব্রাজিল-রেডি পণ্য ও প্যাকেজিং প্রস্তুত করা, স্থানীয় ডিস্ট্রিবিউশন পার্টনার ব্যবহার করা এবং মান ও কমপ্লায়েন্সে বিনিয়োগ করাই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
সমাপনী মন্তব্য
ব্রাজিল ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাংলাদেশি পণ্য আমদানি করছে এবং এই প্রবণতা ক্রমবর্ধমান। এখন সময় এসেছে সুযোগসন্ধানী রপ্তানি ছাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি, খাতভিত্তিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার যেখানে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা ব্রাজিলের অনুমোদিত সরবরাহকারী হয়ে উঠবে এবং বিনিয়োগকারীরা টেকসই বাণিজ্য চ্যানেল নির্মাণ করবে।

