এফবিসিসিআই-এর পুনর্জাগরণ
মোঃ জয়নাল আব্দীন
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (টিআইবি)
সম্পাদক, টিএন্ডআইবি বিজনেস ডিরেক্টরি; নির্বাহী পরিচালক, অনলাইন ট্রেনিং একাডেমি
মহাসচিব, ব্রাজিল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিবিসিসিআই)
একটি এপেক্স চেম্বার বা ফেডারেশন হলো দেশের সকল চেম্বার অব কমার্স ও খাতভিত্তিক বাণিজ্য সংগঠনের সর্বোচ্চ সমন্বয়কারী ও প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান, যার প্রধান দায়িত্ব হলো ব্যবসায়ীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, সমস্যা, সম্ভাবনা ও নীতিগত চাহিদাকে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা, প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং সমন্বিত অবস্থানের মাধ্যমে সরকারের নিকট উপস্থাপন করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এফবিসিসিআই আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেকে দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন হিসেবে পরিচিত করে, যার লক্ষ্য বেসরকারি খাতের স্বার্থ সংরক্ষণ, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গঠনে সহযোগিতা করা।
কিন্তু একটি কার্যকর এপেক্স চেম্বার কেবল নামমাত্র প্রতিনিধিত্ব বা আনুষ্ঠানিক সভা-সেমিনারের প্রতিষ্ঠান নয়। এটি হওয়া উচিত একটি শক্তিশালী “নীতি ইঞ্জিন” যেখানে বিভিন্ন খাতের তথ্য সংগ্রহ, সমস্যা চিহ্নিতকরণ, প্রভাব বিশ্লেষণ, বিকল্প নীতি প্রস্তাব প্রণয়ন এবং সরকার ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে পেশাদার আলোচনার সক্ষমতা থাকে। একই সঙ্গে এটি হওয়া উচিত একটি জবাবদিহিমূলক, পেশাদার ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতিষ্ঠান, যার নিজস্ব দক্ষ জনবল, গবেষণা ইউনিট এবং নিরপেক্ষ সেক্রেটারিয়েট রয়েছে।
একটি আদর্শ এপেক্স চেম্বারের মৌলিক কার্যাবলি
প্রথমত, একটি এপেক্স চেম্বারকে হতে হবে নীতিগত গবেষণা ও অ্যাডভোকেসির কেন্দ্রবিন্দু। রাজস্ব নীতি, শুল্ক কাঠামো, আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া, ব্যাংকিং নীতিমালা, শিল্প উন্নয়ন, বিনিয়োগ পরিবেশ ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মিত গবেষণা ও সুপারিশ তৈরি করা এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এফবিসিসিআই-এর নিজস্ব ঘোষিত কার্যাবলিতেও ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন ও পলিসি অ্যাডভোকেসির বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে, যা বাস্তবায়নের জন্য উচ্চমানের কারিগরি সক্ষমতা অপরিহার্য।
দ্বিতীয়ত, এটি হওয়া উচিত জাতীয় পর্যায়ে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিত্বের কেন্দ্র। বিভিন্ন সরকারি কমিটি, টাস্কফোর্স ও পরামর্শক বোর্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের মতামত উপস্থাপন করা এবং সেই প্রতিনিধিত্বের ফলাফল সদস্যদের কাছে লিখিত আকারে রিপোর্ট করা একটি সুসংহত প্রক্রিয়া হওয়া উচিত।
তৃতীয়ত, একটি আধুনিক এপেক্স চেম্বার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের Federation of Indian Chambers of Commerce and Industry (ফিক্কি), তুরস্কের Union of Chambers and Commodity Exchanges of Turkey (টোব্ব) এবং ব্রাজিলের ApexBrasil (অ্যাপেক্সব্রাজিল) তাদের নিজ নিজ দেশে নীতি গবেষণা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মিশন, রপ্তানি উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে সুসংগঠিত কাঠামোর মাধ্যমে কাজ করে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা দেখায়, কেবল নির্বাচিত নেতৃত্ব নয় একটি শক্তিশালী পেশাদার সেক্রেটারিয়েটই প্রকৃত সাফল্যের ভিত্তি।
কেন এফবিসিসিআই তার কার্যকারিতা হারালো?
এফবিসিসিআই-এর দুর্বলতা কোনো একদিনে সৃষ্টি হয়নি; এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের ফল। অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রভাব, অস্বচ্ছ মনোনীত পরিচালক ব্যবস্থা, অস্বাভাবিকভাবে বড় বোর্ড কাঠামো, অদক্ষ ও অস্থায়ী প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, এবং শক্তিশালী নিজস্ব সেক্রেটারিয়েটের অভাব এসব কারণ মিলেই প্রতিষ্ঠানটিকে ধীরে ধীরে অকার্যকর করে তোলে।
এফবিসিসিআই “ডেড এলিফ্যান্ট” হয়ে যাওয়ার শীর্ষ ১০ কারণ
১) বিকৃত প্রতিনিধিত্ব কাঠামো
যখন সাধারণ পরিষদের সদস্যপদ প্রকৃত ব্যবসায়িক শক্তি বা খাতভিত্তিক অবদান দ্বারা নির্ধারিত না হয়ে বিভিন্ন ক্ষুদ্র বা প্রভাবনির্ভর সংগঠনের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়, তখন প্রতিনিধিত্বের মান নষ্ট হয়। ফলে প্রকৃত শিল্পপতিরা বাদ পড়ে যান এবং নীতিগত আলোচনায় বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন থাকে না।
২) মনোনীত পরিচালক ব্যবস্থা একটি “বিশেষ শ্রেণি” তৈরি করে
মনোনীত পরিচালক ব্যবস্থা নির্বাচনী বৈধতার বাইরে একটি ক্ষমতাধর গোষ্ঠী সৃষ্টি করে। এতে বোর্ডে প্রভাব অর্জনের জন্য লবিং বৃদ্ধি পায় এবং নীতিগত কাজের পরিবর্তে অবস্থান রক্ষার রাজনীতি মুখ্য হয়ে ওঠে।
৩) অস্বাভাবিকভাবে বড় বোর্ড কাঠামো
৭০–৮০ সদস্যের বোর্ড কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। এত বড় বোর্ডে জবাবদিহিতা ক্ষীণ হয়, সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হয় এবং সমন্বয় জটিল হয়ে ওঠে।
৪) প্রশাসকনির্ভর ধারাবাহিকতার অভাব
প্রতিষ্ঠানের ওপর বারবার প্রশাসক নিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। নীতি প্রক্রিয়া ধারাবাহিক না থাকলে ব্যবসায়ীরা আস্থা হারায়।
৫) শক্তিশালী সেক্রেটারিয়েটের অভাব
যদি নিজস্ব গবেষণা, বিশ্লেষণ, নথি প্রস্তুত ও ফলো-আপ ব্যবস্থাপনা না থাকে, তবে প্রতিষ্ঠান কেবল আনুষ্ঠানিক সভা আয়োজনকারী সংস্থায় পরিণত হয়। দক্ষ জনবল ছাড়া কোনো এপেক্স চেম্বার টিকে থাকতে পারে না।
৬) অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রভাব
যখন নীতিগত আলোচনার পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রাজনীতি মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন প্রতিষ্ঠান তার মূল উদ্দেশ্য হারায় এবং ব্যবসায়ীদের আস্থা নষ্ট হয়।
৭) স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি
স্বচ্ছ নিয়োগ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও স্বার্থের সংঘাত নিরসনের স্পষ্ট নীতিমালা না থাকলে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।
৮) কমিটি ব্যবস্থার অকার্যকারিতা
যদি সরকারি কমিটিতে প্রতিনিধিত্বের পর লিখিত রিপোর্ট ও ফলো-আপ না থাকে, তবে সেই প্রতিনিধিত্ব কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে।
৯) মন্ত্রণালয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
একটি স্বাধীন এপেক্স চেম্বারের নিজস্ব কর্মসূচি ও নীতি অবস্থান থাকা উচিত। অতিরিক্ত প্রশাসনিক প্রভাব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা সীমিত করে।
১০) আধুনিক সেবা প্রদান ব্যর্থতা
ট্যারিফ সহায়তা, বাণিজ্য তথ্যসেবা, ম্যাচমেকিং, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি বাস্তব সেবা না থাকলে ব্যবসায়ীরা প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযোগ হারায়।
বাংলাদেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন এফবিসিসিআই পুনর্গঠনের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা
বাংলাদেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন এফবিসিসিআই-কে একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও পেশাদার এপেক্স চেম্বারে রূপান্তর করতে হলে পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়ন অপরিহার্য। নিচে প্রস্তাবিত স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার প্রতিটি কার্যক্রম এক অনুচ্ছেদে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হলো।
স্বল্পমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা (০–৬ মাস)
১) সংস্কার ও সততা কমিশন গঠন
এফবিসিসিআই-এর ভেতরে একটি সময়সীমাবদ্ধ “সংস্কার ও সততা কমিশন” গঠন করা উচিত, যেখানে অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী নেতা, আইন বিশেষজ্ঞ, সুশাসন বিশেষজ্ঞ এবং নিরপেক্ষ পেশাজীবীরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এই কমিশনের কাজ হবে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা চিহ্নিত করা, অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার রোডম্যাপ প্রণয়ন করা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা। এতে সদস্যদের মধ্যে আস্থা ফিরবে এবং সংস্কার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।
২) স্বার্থের সংঘাত ঘোষণা বাধ্যতামূলক করা
সকল পরিচালক, কমিটি চেয়ারম্যান এবং গুরুত্বপূর্ণ পদধারীদের জন্য লিখিতভাবে স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) ঘোষণা বাধ্যতামূলক করা উচিত। এতে বোর্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের অভিযোগ কমবে। একটি মানসম্মত ঘোষণা ফরম প্রণয়ন করে তা বার্ষিক হালনাগাদ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির নৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হবে।
৩) সদস্যপদ ও সাধারণ পরিষদের নিরীক্ষা
সাধারণ পরিষদের সদস্যদের বৈধতা, কার্যক্রম, ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা এবং প্রতিনিধিত্বের মান যাচাই করার জন্য একটি স্বচ্ছ নিরীক্ষা পরিচালনা করা জরুরি। এই প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত করতে হবে যে শুধুমাত্র প্রকৃত ও সক্রিয় বাণিজ্য সংগঠন এবং ব্যবসায়ীরা সাধারণ পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করছেন। এতে এফবিসিসিআই-এর সিদ্ধান্তগুলো বাস্তব অর্থনীতির প্রতিফলন ঘটাবে।
৪) কার্যকর নির্বাহী কমিটি ক্ষমতায়ন
অস্বাভাবিক বড় বোর্ড কাঠামোর কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হলে একটি ছোট, ক্ষমতাসম্পন্ন নির্বাহী কমিটি গঠন করে তাকে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিতে হবে। এই কমিটির কাজ ও ক্ষমতার সীমা লিখিতভাবে নির্ধারণ করে বোর্ডে অনুমোদন দিতে হবে, যাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।
৫) নীতি সহায়তা ও সমস্যা সমাধান ডেস্ক চালু
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ ২০টি জরুরি সমস্যার সমাধানের জন্য একটি “নীতি সহায়তা ডেস্ক” চালু করা উচিত, যেখানে কাস্টমস, কর, ব্যাংকিং, আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত সমস্যা নথিভুক্ত ও অনুসরণ করা হবে। সাপ্তাহিক অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করলে সদস্যরা দৃশ্যমান ফলাফল দেখতে পাবেন এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বাড়বে।
৬) কমিটি প্রতিনিধিত্ব ও রিপোর্টিং ইউনিট গঠন
সরকারি কমিটি ও টাস্কফোর্সে যারা এফবিসিসিআই-এর প্রতিনিধিত্ব করেন, তাদের কার্যক্রম, আলোচ্য বিষয় ও সিদ্ধান্তসমূহ লিখিতভাবে সংগ্রহ ও সদস্যদের কাছে প্রচারের জন্য একটি আলাদা ইউনিট গঠন করতে হবে। এতে প্রতিনিধিত্ব অর্থবহ হবে এবং নীতিগত অগ্রগতি ট্র্যাক করা সম্ভব হবে।
৭) কাস্টমস, ট্যারিফ ও কর সহায়তা সেল
আমদানি-রপ্তানি সংশ্লিষ্ট শুল্ক ও কর সংক্রান্ত জটিলতা সমাধানের জন্য একটি বিশেষায়িত সহায়তা সেল গঠন করতে হবে, যেখানে অভিযোগ ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থাকবে। এই সেলের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য ভবিষ্যৎ নীতি আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
৮) বোর্ড উপস্থিতি ও সিদ্ধান্ত প্রকাশ
বোর্ড সভায় উপস্থিতি, ভোটিং রেকর্ড এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সারাংশ নিয়মিত প্রকাশ করলে জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে। এতে বোর্ড সদস্যদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত হবে এবং সদস্যরা নেতৃত্বের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে পারবেন।
৯) মেধাভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ
অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি পদ নীতি ও গবেষণা প্রধান, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন লিড এবং কমিউনিকেশন/ডেটা অফিসার উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিয়োগ দিতে হবে। পেশাদার নিয়োগ এফবিসিসিআই-এর কার্যক্রমকে কাঠামোবদ্ধ ও ফলপ্রসূ করবে।
১০) বেতন কাঠামো সংস্কার
সেক্রেটারিয়েটের জন্য একটি স্বচ্ছ গ্রেড ও বেতন কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে, যাতে দক্ষ জনবল আকর্ষণ ও ধরে রাখা যায়। প্রতিযোগিতামূলক বেতন ও কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রবর্তন করলে পেশাদার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
মধ্যমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা (৬–১৮ মাস)
১) মনোনীত পরিচালক ব্যবস্থা সংস্কার বা বিলোপ
মনোনীত পরিচালক ব্যবস্থার প্রভাব সীমিত বা বিলোপ করতে বিধিমালা সংশোধন করতে হবে, যাতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বোর্ড গঠিত হয়। এতে গণতান্ত্রিক বৈধতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
২) প্রতিনিধিত্বের মানদণ্ড পুনর্গঠন
সাধারণ পরিষদ ও বোর্ডে প্রতিনিধিত্বের জন্য ব্যবসায়িক কার্যক্রম, টার্নওভার, কর্মসংস্থান অবদান ইত্যাদি নির্দিষ্ট মানদণ্ড প্রবর্তন করতে হবে, যাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা নেতৃত্বে আসতে পারেন।
৩) বোর্ড আকার যৌক্তিক সীমায় আনা
বোর্ড সদস্য সংখ্যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সীমিত করে কার্যকর আকারে আনতে হবে। ছোট বোর্ড দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করবে।
৪) সেক্টর কমিটি পুনর্গঠন
প্রতিটি খাতভিত্তিক কমিটিকে নির্দিষ্ট কাজ, সময়সীমা ও আউটপুট নির্ধারণ করে সক্রিয় করতে হবে। ত্রৈমাসিক নীতি প্রস্তাব ও প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
৫) নীতি ও গবেষণা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা
একটি পূর্ণাঙ্গ নীতি ও গবেষণা অধিদপ্তর গঠন করে নিয়মিত “বিজনেস ব্যারোমিটার” ও নীতি ব্রিফ প্রকাশ করতে হবে। এতে সরকার ও মিডিয়ায় এফবিসিসিআই-এর প্রভাব বাড়বে।
৬) সরকারি সমন্বয় সেল
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাথে কাঠামোবদ্ধ যোগাযোগ ও ফলো-আপের জন্য একটি সরকারি সমন্বয় সেল প্রতিষ্ঠা করা উচিত, যা নির্ধারিত সময়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন দেবে।
৭) মান নিয়ন্ত্রণ ও স্বীকৃতি ব্যবস্থা
সদস্য চেম্বারগুলোর জন্য একটি মান নিয়ন্ত্রণ ও স্বীকৃতি কাঠামো প্রবর্তন করলে তাদের সেবার মান উন্নত হবে এবং সমন্বিত সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
৮) কাঠামোবদ্ধ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মিশন
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মিশন ও প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের জন্য যাচাইকৃত ক্রেতা-বিক্রেতা তালিকা, পূর্বনির্ধারিত বৈঠক ও পরবর্তী ফলো-আপ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
৯) ডিজিটাল সদস্যপদ ও ভোটিং ব্যবস্থা
সদস্যপদ, ভোটিং ও কমিটি কার্যক্রম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে গেলে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।
১০) স্বাধীন নিরীক্ষা ও কমপ্লায়েন্স ইউনিট
অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও কমপ্লায়েন্স ইউনিট প্রতিষ্ঠা করে আর্থিক ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা (১৮–৩৬ মাস)
১) বাণিজ্য ও প্রতিযোগিতা ইনস্টিটিউট
একটি স্থায়ী প্রশিক্ষণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে ব্যবসায়ী ও চেম্বার নেতাদের দক্ষতা উন্নয়ন করা যেতে পারে।
২) ট্যারিফ ও নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র
শুল্ক ও অ-শুল্ক প্রতিবন্ধকতা বিশ্লেষণের জন্য একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করলে নীতি প্রস্তাব প্রমাণভিত্তিক হবে।
৩) আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অধিদপ্তর
দেশভিত্তিক ডেস্ক ও আন্তর্জাতিক চেম্বার নেটওয়ার্ক তৈরি করে বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
৪) বার্ষিক ব্যবসা সংস্কার সম্মেলন
প্রতি বছর একটি ব্যবসা সংস্কার সম্মেলনের মাধ্যমে নীতি চুক্তি ও অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত।
৫) পেশাদার প্রদর্শনী ব্যবস্থাপনা ইউনিট
বাণিজ্য মেলা ও প্রদর্শনী পরিচালনার জন্য আলাদা পেশাদার ইউনিট গঠন করলে রাজস্ব ও কার্যকারিতা বাড়বে।
৬) নেতৃত্বের মেয়াদ ও যোগ্যতা নির্ধারণ
নেতৃত্বের মেয়াদ সীমা ও ব্যবসায়িক যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করে প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যেতে পারে।
৭) টেকসই আর্থিক মডেল
প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও সেবা ফি-ভিত্তিক আয়ের মাধ্যমে আর্থিক স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হবে।
৮) এসএমই উন্নয়ন তহবিল
এসএমই খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অংশীদারিত্বমূলক তহবিল গঠন করা যেতে পারে।
৯) প্রবাসী ব্যবসায়িক কাউন্সিল
প্রবাসী উদ্যোক্তাদের নিয়ে গ্লোবাল বিজনেস কাউন্সিল গঠন করে বিনিয়োগ ও রপ্তানি সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে।
১০) স্বায়ত্তশাসন সনদ প্রণয়ন
সরকারের সাথে কাঠামোবদ্ধ সম্পর্ক বজায় রেখে একটি স্বায়ত্তশাসন সনদ প্রণয়ন করলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে।
উপসংহার
এফবিসিসিআই পুনর্জাগরণের প্রকৃত পরীক্ষা হবে তখনই, যখন সাধারণ পরিষদ প্রকৃত ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করবে, বোর্ড হবে ছোট ও জবাবদিহিমূলক, এবং সেক্রেটারিয়েট হবে পেশাদার, দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক বেতনে পরিচালিত। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায় শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, স্বচ্ছতা, এবং পেশাদারিত্বই একটি এপেক্স চেম্বারকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। বাংলাদেশের ব্যবসায়িক ভবিষ্যতের স্বার্থে এখনই সেই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি।