বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানি
মোঃ জয়নাল আব্দীন
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (T&IB)
নির্বাহী পরিচালক, অনলাইন ট্রেনিং একাডেমি (OTA)
মহাসচিব, ব্রাজিল–বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (BBCCI)
বাংলাদেশ সাধারণত তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য পরিচিত হলেও কৃষি ও কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প ধীরে ধীরে বৈশ্বিক বাজারে একটি দৃশ্যমান অবস্থান তৈরি করছে বিশেষ করে যেখানে সারা বছর সরবরাহ সক্ষমতা, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এবং প্রবাসী জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাসজনিত চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানি প্রায় ১.০৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে এবং কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি ছিল প্রায় ৩৪১.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রমাণ করে যে কাঁচা পণ্যের বাইরে মূল্য সংযোজনভিত্তিক রপ্তানি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হচ্ছে।
বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির প্রবণতা: অগ্রগতি থাকলেও অস্থিরতা বিদ্যমান
বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানি সম্ভাবনাময় হলেও এর পারফরম্যান্স আবহাওয়া, মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন ব্যয় ও নির্দিষ্ট বাজারের ওপর অতিনির্ভরতার কারণে ওঠানামা করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২–২৩ অর্থবছরে কৃষিপণ্য রপ্তানি আয় ছিল ৮৪৩.০৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে ২০২১–২২ অর্থবছরে তা ছিল ১.১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই ওঠানামা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি ইঙ্গিত দেয় যে যারা মান, পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনা ও বাজার বৈচিত্র্যে বিনিয়োগ করবে, তারা স্থিতিশীল ও উচ্চমূল্যের বাজার ধরতে পারবে।
বাংলাদেশ কী কী কৃষিপণ্য রপ্তানি করে: আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দৃষ্টিতে রপ্তানি ঝুড়ি
বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানি মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় বিভক্ত:
তাজা ফল ও সবজি: যেখানে দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে এবং তাজা পণ্যের চাহিদা বেশি, সেখানে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে। তবে এই খাতটি কোল্ড চেইন, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ নিয়ন্ত্রণ ও প্যাকেজিং শৃঙ্খলার ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল।
মসলা ও শুকনো কৃষিপণ্য: মসলা ও শুকনো খাদ্যপণ্য তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ পরিবহন সহনশীল হওয়ায় সহজে রপ্তানি করা যায়। সঠিকভাবে বাছাই, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ও উন্নত প্যাকেজিং এই খাতে প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে।
চা ও প্ল্যান্টেশনভিত্তিক পণ্য: চা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি পণ্য। তবে কমোডিটি রপ্তানির বাইরে ব্র্যান্ডিং, বিশেষায়িত চা ও প্রাইভেট লেবেল সরবরাহের মাধ্যমে উচ্চমূল্যের বাজার ধরার সুযোগ রয়েছে।
কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত খাদ্য: এই খাতটি সবচেয়ে কৌশলগত, কারণ এতে উচ্চমূল্য সংযোজন হয় এবং পুনরাবৃত্ত অর্ডারের সম্ভাবনা থাকে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৩৪১.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি করেছে, যা প্রায় ১০০টি দেশে পৌঁছেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা: কোথা থেকে আসে এবং কীভাবে আসে
বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির চাহিদা মূলত তিনটি চ্যানেল থেকে আসে:
প্রবাসী ও জাতিগত বাজার: প্রবাসী জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাস বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের একটি স্থায়ী চাহিদা তৈরি করে।
মূলধারার খুচরা ও ফুডসার্ভিস বাজার: এই বাজারে মূল্য বেশি হলেও মান, অডিট, ট্রেসেবিলিটি ও লেবেলিং কমপ্লায়েন্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিল্প ও উপাদানভিত্তিক ক্রেতা: খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকারী ও মসলা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিক মানসম্পন্ন কাঁচামাল চায়। বাংলাদেশ যদি নির্ভরযোগ্য মান বজায় রাখতে পারে, তবে এই বাজার দ্রুত সম্প্রসারণ সম্ভব।

কমপ্লায়েন্স ও মান নিয়ন্ত্রণ: সাফল্যের মূল চাবিকাঠি
কৃষিপণ্য রপ্তানিতে শুধু কম দাম যথেষ্ট নয় প্রমাণভিত্তিক মান নিশ্চিত করা জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য নিরাপত্তা ও ট্রেসেবিলিটির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বাস্তবিকভাবে গুরুত্ব দিতে হবে:
- খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও অডিট প্রস্তুতি,
- কীটনাশক অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু ও মাইক্রোবায়োলজিক্যাল নিয়ন্ত্রণ,
- প্যাকেজিং ও লেবেলিংয়ের আন্তর্জাতিক মান মেনে চলা।
লজিস্টিকস ও কোল্ড চেইন: রপ্তানির মূল্য সুরক্ষা
কৃষিপণ্য রপ্তানিতে পরিবহন ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পোস্ট-হারভেস্ট হ্যান্ডলিং, উপযুক্ত পরিবহন মাধ্যম নির্বাচন এবং সঠিক ডকুমেন্টেশন রপ্তানির ঝুঁকি কমায় ও লাভ বাড়ায়।
মূল্য সংযোজন: প্রতি চালানে আয়ের পরিমাণ কীভাবে বাড়ানো যায়
শুধু পরিমাণ বাড়ালেই লাভ বাড়ে না; বরং প্রক্রিয়াজাতকরণ, আধুনিক প্যাকেজিং, প্রাইভেট লেবেল সরবরাহ এবং টেকসই উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে প্রতি ইউনিটে আয় বাড়ানো সম্ভব।
রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকদের প্রধান চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে খণ্ডিত সরবরাহ ব্যবস্থা, মানের অসামঞ্জস্য ও কমপ্লায়েন্স ঘাটতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সমাধান হলো সংগঠিত সোর্সিং, মানসম্মত স্পেসিফিকেশন, নিয়মিত পরীক্ষা এবং পেশাদার ক্রেতা ব্যবস্থাপনা।
T&IB-এর মাধ্যমে ক্রেতা–বিক্রেতা ম্যাচমেকিং: কৃষিপণ্য রপ্তানির কার্যকর সমাধান
কৃষিপণ্য রপ্তানিতে সবচেয়ে বড় বাধা হলো নির্ভরযোগ্য অংশীদার খুঁজে পাওয়া। Trade & Investment Bangladesh (T&IB) রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকদের মধ্যে কার্যকর ম্যাচমেকিং সেবা দিয়ে এই ঝুঁকি কমায়।
T&IB রপ্তানিকারকদের পণ্য প্রোফাইলিং, বাজার বিশ্লেষণ ও কমপ্লায়েন্স প্রস্তুতিতে সহায়তা করে এবং বিদেশি আমদানিকারকদের জন্য যাচাইকৃত বাংলাদেশি সরবরাহকারী নির্বাচন, নমুনা ও আলোচনা সমন্বয় করে।
উপসংহার
বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানি ইতোমধ্যে ১.০৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি ৩৪১.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য মান, ট্রেসেবিলিটি, লজিস্টিকস ও বাজার বৈচিত্র্য অপরিহার্য। রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক যারা নির্ভরযোগ্য অংশীদার ও দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়ন চান, তাদের জন্য T&IB-এর ক্রেতা–বিক্রেতা ম্যাচমেকিং সেবা একটি কার্যকর সমাধান।

