বাংলাদেশের ঘড়ি শিল্প: বর্তমান অবস্থা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা
মোঃ জয়নাল আব্দীন
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (T&IB)
নির্বাহী পরিচালক, অনলাইন ট্রেনিং একাডেমি (OTA)
মহাসচিব, ব্রাজিল–বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (BBCCI)
বিশ্বব্যাপী ঘড়ি শিল্প বর্তমানে একটি দ্রুত বর্ধনশীল ও উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক শিল্পখাতে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক ঘড়ি বাজারের আকার প্রায় ১০৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে এবং ২০৩৩ সালের মধ্যে এটি প্রায় ১৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে বলে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, বিলাসপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি, স্মার্টওয়াচ ও ওয়্যারেবল প্রযুক্তির প্রসার এবং উদীয়মান অর্থনীতিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণ এই সবকিছু মিলিয়ে ঘড়ি শিল্প এখন আর শুধু সময় জানার যন্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি ফ্যাশন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও লাইফস্টাইলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঘড়ি শিল্প এখনও মূলত একটি আমদানিনির্ভর ভোক্তা শিল্প হিসেবে সীমাবদ্ধ। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে আয় বৃদ্ধি, নগরায়ণ, ভোক্তা সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রসারের ফলে ঘড়ির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, তবুও এই চাহিদার বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন কাঠামো গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের বাজারে বিক্রিত প্রায় সব ধরনের হাতঘড়ি সাধারণ কোয়ার্টজ ঘড়ি থেকে শুরু করে বিলাসী ও স্মার্টওয়াচ পর্যন্ত বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। স্থানীয়ভাবে যা কিছু উৎপাদন বা সংযোজন হয়, তা মূলত ক্ষুদ্র পরিসরের দেয়ালঘড়ি ও সাধারণ ক্লক শিল্পেই সীমাবদ্ধ।
এই প্রবন্ধে বাংলাদেশের ঘড়ি শিল্পের একটি সমন্বিত ও গভীর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে শিল্পের বর্তমান অবস্থা, গত এক দশকের আমদানি বনাম স্থানীয় সংযোজন প্রবণতা, প্রধান আমদানিকারক দেশসমূহ, দেশীয় উৎপাদনের সম্ভাবনা, শিল্প বিকাশের কাঠামোগত ও নীতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং একটি রপ্তানিমুখী ঘড়ি শিল্প গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।
বাংলাদেশের ঘড়ি শিল্পের বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো বৃহৎ বা মাঝারি আকারের সংগঠিত ঘড়ি উৎপাদন কারখানা নেই। দেশের ঘড়ি বাজার সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর, যেখানে বিদেশি ব্র্যান্ড ও পণ্যই আধিপত্য বিস্তার করে আছে। ঢাকার পাটুয়াটুলি, চকবাজার, গুলিস্তান, নিউ মার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকায় শত শত ঘড়ির দোকান রয়েছে, যেখানে নিম্নমূল্যের চীনা ঘড়ি থেকে শুরু করে ইউরোপীয় বিলাসী ঘড়ি পর্যন্ত সব ধরনের পণ্য বিক্রি হয়।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে বিক্রিত ঘড়ির সিংহভাগ চীন থেকে আমদানি করা হয়। চীনা ঘড়ি কম দামে সহজলভ্য হওয়ায় তা সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। এর পাশাপাশি ভারত থেকে দক্ষিণ এশিয়ার জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের ঘড়ি আমদানি করা হয় এবং উচ্চমূল্যের বিলাসী ঘড়ির ক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ড ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে।
স্থানীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঢাকার কিছু এলাকায় এবং দেশের কয়েকটি অঞ্চলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাভিত্তিক ওয়ার্কশপে দেয়ালঘড়ি ও সাধারণ ক্লক তৈরি করা হয়। এসব উদ্যোগ সাধারণত আমদানিকৃত যন্ত্রাংশ ও মেশিনের ওপর নির্ভরশীল এবং এগুলোকে প্রকৃত অর্থে শিল্পকারখানা বলা যায় না। হাতঘড়ির ক্ষেত্রে দেশীয় সংযোজন কার্যত নেই বললেই চলে। অতীতে কিছু উদ্যোক্তা হাতঘড়ি সংযোজনের চেষ্টা করলেও সস্তা আমদানিকৃত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে বিলাসী ঘড়ির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গুলশান, বনানী ও বারিধারার মতো এলাকায় কয়েক লক্ষ টাকা মূল্যের ঘড়ি বিক্রি এখন একটি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘড়ি সামাজিক মর্যাদা, ব্যক্তিত্বের প্রকাশ এবং এমনকি বিকল্প বিনিয়োগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
তবুও বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ এখনও একটি “মেইড ইন বাংলাদেশ” হাতঘড়ি শিল্প গড়ে তুলতে পারেনি। যদিও সম্প্রতি একটি-দুটি ক্ষুদ্র উদ্যোগ দেশীয় ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, সেগুলো এখনো সীমিত উৎপাদন ও আমদানিনির্ভর যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল।
গত ১০ বছরে আমদানি বনাম স্থানীয় সংযোজন প্রবণতা
গত এক দশকে বাংলাদেশের ঘড়ি আমদানির পরিমাণ ও মূল্য উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি এবং নগর মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণ এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় সাময়িকভাবে আমদানি কমলেও পরবর্তী সময়ে তা পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
অন্যদিকে, একই সময়ে স্থানীয়ভাবে সংযোজিত বা উৎপাদিত ঘড়ির পরিমাণ কার্যত অপরিবর্তিত রয়েছে। দেয়ালঘড়ি ও সাধারণ ক্লক ছাড়া দেশীয় উৎপাদনের কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। ফলে গত দশকে বাংলাদেশের ঘড়ি বাজারে আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদনের মধ্যে একটি চরম ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে, যেখানে আমদানির অংশ প্রায় সম্পূর্ণ বাজার দখল করে রেখেছে।

বাংলাদেশের ঘড়ি আমদানির প্রধান উৎস
বাংলাদেশে ঘড়ি আমদানির প্রধান উৎস দেশ হলো চীন, ভারত ও সুইজারল্যান্ড। চীন নিম্ন ও মধ্যমূল্যের ঘড়ির ক্ষেত্রে সর্ববৃহৎ সরবরাহকারী। ভারত থেকে আঞ্চলিক বাজারে জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের ঘড়ি আমদানি করা হয়। সুইজারল্যান্ড ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে মূলত বিলাসী ও উচ্চমূল্যের ঘড়ি আসে, যা একটি তুলনামূলকভাবে ছোট কিন্তু লাভজনক বাজার খাত তৈরি করেছে।
এছাড়া, বাংলাদেশ ঘড়ির যন্ত্রাংশ যেমন মুভমেন্ট, গ্লাস, ব্যাটারি ও অন্যান্য উপাদান—জাপান, চীন ও ইউরোপ থেকে আমদানি করে, যা সীমিত আকারে স্থানীয় সংযোজন ও মেরামত কাজে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশের ঘড়ি উৎপাদনের সম্ভাবনা
বর্তমান সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, বাংলাদেশে ঘড়ি উৎপাদনের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বরং সঠিক নীতি সহায়তা ও শিল্প পরিকল্পনার মাধ্যমে এই খাতটি একটি নতুন রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপ নিতে পারে।
প্রথমত, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার নিজেই একটি বড় শক্তি। ক্রমবর্ধমান ভোক্তা শ্রেণি ঘড়ির জন্য একটি স্থিতিশীল চাহিদা তৈরি করছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ইলেকট্রনিক্স ও হালকা প্রকৌশল খাতে সংযোজনভিত্তিক শিল্পে দক্ষতা অর্জন করেছে, যা ঘড়ি শিল্পের জন্য একটি সহায়ক ভিত্তি হতে পারে।
তৃতীয়ত, তুলনামূলকভাবে কম বিনিয়োগে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাভিত্তিক ঘড়ি সংযোজন ইউনিট স্থাপন সম্ভব। চতুর্থত, বিশেষ নকশা, সাংস্কৃতিক উপাদান ও সীমিত সংস্করণের মাধ্যমে দেশীয় ঘড়ি ব্র্যান্ড আন্তর্জাতিক বাজারে একটি আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলতে পারে।
ঘড়ি শিল্প বিকাশের প্রধান প্রতিবন্ধকতা
বাংলাদেশে ঘড়ি শিল্প বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো সস্তা আমদানিকৃত ঘড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতা। চীনা ঘড়ি অত্যন্ত কম দামে বাজারে প্রবেশ করায় স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এছাড়া কর ও শুল্ক কাঠামো স্থানীয় উৎপাদনের জন্য অনুকূল নয়। দেশীয়ভাবে সংযোজিত ঘড়ির ওপর ভ্যাট আরোপ করা হলেও আমদানিকৃত ঘড়ির ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম শুল্ক প্রযোজ্য—যা স্থানীয় শিল্পকে নিরুৎসাহিত করে।
দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং গবেষণা অবকাঠামোর অভাবও একটি বড় সীমাবদ্ধতা। একই সঙ্গে ভোক্তাদের মধ্যে দেশীয় ব্র্যান্ড সম্পর্কে আস্থার ঘাটতি রয়েছে।
রপ্তানিমুখী ঘড়ি শিল্প গড়ে তোলার জন্য সুপারিশ
বাংলাদেশে একটি রপ্তানিমুখী ঘড়ি শিল্প গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন। দেশীয় ঘড়ি উৎপাদনকে কুটির বা ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ভ্যাট ও কর ছাড় প্রদান করা যেতে পারে।
ঘড়ি নির্মাণ ও মেরামতের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে রপ্তানি প্রণোদনা, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ এবং ব্র্যান্ডিং সহায়তা প্রদান করতে হবে।
ইলেকট্রনিক্স, চামড়া ও হালকা প্রকৌশল শিল্পের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ ঘড়ি শিল্প ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব।
উপসংহার
বাংলাদেশের ঘড়ি শিল্প বর্তমানে একটি সুপ্ত সম্ভাবনাময় খাত। শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা থাকা সত্ত্বেও শিল্পটি এখনও আমদানিনির্ভর রয়ে গেছে। তবে সঠিক নীতি সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি টেকসই ও রপ্তানিমুখী ঘড়ি শিল্প গড়ে তুলতে পারে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়বে এবং “মেইড ইন বাংলাদেশ” ব্র্যান্ড বৈশ্বিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

