বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের মধ্যে বাণিজ্য সম্ভাবনা
মোঃ জয়নাল আব্দীন
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ
সম্পাদক, টিএন্ডআইবি বিজনেস ডিরেক্টরি; নির্বাহী পরিচালক, অনলাইন ট্রেনিং একাডেমি
মহাসচিব, ব্রাজিল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি
বাংলাদেশ ও ব্রাজিল দুটি উদীয়মান ও গতিশীল অর্থনীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা ক্রমশ জোরদার করছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪ সালে প্রায় ২.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তবে এই বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা স্পষ্ট, কারণ বাংলাদেশ ব্রাজিল থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, অথচ রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এই বাণিজ্য ঘাটতি বাংলাদেশে রপ্তানি সম্প্রসারণের পাশাপাশি উভয় দেশের জন্য বাণিজ্য বৈচিত্র্যকরণের এক বিশাল অব্যবহৃত সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর এবং সাও পাওলোতে অনুষ্ঠিত মেড ইন বাংলাদেশ ট্রেড এক্সপোর মতো উদ্যোগগুলো দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। ব্রাজিলের অর্থনীতি (জিডিপি প্রায় ২.১৮ ট্রিলিয়ন ডলার) বাংলাদেশের অর্থনীতির (জিডিপি প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার) তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বড় এবং উভয় দেশেরই বৃহৎ ভোক্তা বাজার রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করা রপ্তানিকারক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই গবেষণাধর্মী প্রবন্ধে বাংলাদেশ ব্রাজিল বাণিজ্যের বর্তমান চিত্র, সর্বোচ্চ সম্ভাবনাময় খাতসমূহ এবং ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের জন্য কৌশলগত করণীয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বর্তমান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশ–ব্রাজিল বাণিজ্য ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেলেও এটি মূলত পরিপূরক পণ্যের বিনিময়ের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্রাজিলে প্রায় ২৪২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে, বিপরীতে ব্রাজিল থেকে প্রায় ২.৪৮ বিলিয়ন ডলার আমদানি করেছে। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট যে বাংলাদেশ একটি বড় বাণিজ্য ঘাটতির মুখোমুখি।
বাংলাদেশের রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে ২০২২ সালে প্রায় ১৬০ মিলিয়ন ডলার, ২০২৩ সালে ২০৪ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৪ সালে ২৪২ মিলিয়ন ডলার অন্যদিকে আমদানি আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্যের ওপর নির্ভর করে ওঠানামা করেছে। মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ২০২৪ সালে প্রায় ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২.৭৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির প্রতিফলন।
ব্রাজিলে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য
বাংলাদেশের ব্রাজিলে রপ্তানি প্রধানত প্রস্তুত পোশাকনির্ভর। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্রাজিলে প্রায় ১৮৭ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। রপ্তানি পণ্যের মধ্যে জার্সি, পুলওভার, কার্ডিগান, শার্ট, ট্রাউজার ও জ্যাকেটের মতো পোশাকই সর্বাধিক অংশ দখল করে আছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হওয়ায় এই প্রবণতা স্বাভাবিক। পোশাকের বাইরে বাংলাদেশ সীমিত পরিমাণে টেক্সটাইল, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত জুতা এবং ওষুধও ব্রাজিলে রপ্তানি করে। এসব খাত তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের জন্য উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা বহন করে।
বাংলাদেশে ব্রাজিলের প্রধান রপ্তানি পণ্য
বাংলাদেশে ব্রাজিলের রপ্তানি মূলত কৃষিপণ্য ও কাঁচামালনির্ভর। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ব্রাজিল বাংলাদেশে প্রায় ২.৬৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। প্রধান আমদানিকৃত পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- চিনি ও আখজাত পণ্য: ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চিনি উৎপাদক এবং বাংলাদেশের চিনি আমদানির একটি বড় অংশ ব্রাজিল থেকে আসে।
- কাঁচা তুলা: বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তুলা আমদানিকারক এবং ব্রাজিল বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী।
- সয়াবিন ও তেলবীজ: পশুখাদ্য ও ভোজ্যতেল উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশ ব্রাজিল থেকে ব্যাপকভাবে সয়াবিন ও সয়াবিন তেল আমদানি করে।
- ভোজ্যতেল ও চর্বি: সয়াবিন তেলসহ বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ তেল বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
- অন্যান্য পণ্য: লোহা ও ইস্পাত, চামড়া ও কিছু রাসায়নিক পণ্যও আমদানির তালিকায় রয়েছে।
এই বাণিজ্য কাঠামো থেকে স্পষ্ট হয় যে বাংলাদেশ মূলত প্রস্তুত পণ্য রপ্তানি করে এবং ব্রাজিল থেকে কাঁচামাল ও কৃষিপণ্য আমদানি করে যা একটি শক্তিশালী পরিপূরক সম্পর্ক নির্দেশ করে।

তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল: উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাময় খাত
প্রস্তুত পোশাক খাত বাংলাদেশের বৈশ্বিক রপ্তানির মূল চালিকাশক্তি এবং ব্রাজিলেও এটি বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য। ব্রাজিল লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ায় এবং সেখানে ভোক্তা চাহিদা বাড়ায় বাংলাদেশি পোশাকের জন্য বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২২ সালে ব্রাজিল প্রায় ৫.৯ বিলিয়ন ডলার মূল্যের টেক্সটাইল ও পোশাক আমদানি করেছে, যেখানে বাংলাদেশের অংশ ছিল মাত্র প্রায় ২.৫ শতাংশ। এটি স্পষ্টভাবে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ নির্দেশ করে।
বাংলাদেশি পোশাকের প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা এবং ব্রাজিলের ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির চাহিদা সব মিলিয়ে এই খাতে রপ্তানি বৃদ্ধির বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি ব্রাজিলের তুলা রপ্তানি ও বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক সংযোগ তৈরি হয়েছে, যা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক।
কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্প: পরিপূরক চাহিদা পূরণ
কৃষি খাত ব্রাজিলের রপ্তানি অর্থনীতির ভিত্তি এবং বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিনি, সয়াবিন, ভুট্টা ও পশুখাদ্য সরবরাহে ব্রাজিল বাংলাদেশের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য উৎস।
অন্যদিকে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্য পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে ব্রাজিলে নতুন বাজার তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে টেকসই প্যাকেজিংয়ের জন্য বাংলাদেশ–ব্রাজিল যৌথ উদ্যোগের প্রস্তাব এই সম্ভাবনারই প্রমাণ।
এছাড়া কৃষি প্রযুক্তি, প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে উভয় দেশের মধ্যে সহযোগিতা পারস্পরিক লাভজনক হতে পারে।
ফার্মাসিউটিক্যালস ও স্বাস্থ্যখাতে সহযোগিতা
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প গত দুই দশকে ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়েছে এবং বর্তমানে শতাধিক দেশে জেনেরিক ওষুধ রপ্তানি করছে। ব্রাজিলের বিশাল স্বাস্থ্যখাতে সাশ্রয়ী ও মানসম্পন্ন ওষুধ সরবরাহের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশি ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে ব্রাজিলি পরিবেশকদের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এই সম্ভাবনার বাস্তব প্রতিফলন। নিয়ন্ত্রক অনুমোদন ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে এই খাত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ
ব্রাজিল জ্বালানি সম্পদে সমৃদ্ধ, অন্যদিকে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার মুখোমুখি। বায়োফুয়েল, বিশেষ করে ইথানল উৎপাদনে ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান হতে পারে। পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি, যেমন সৌর ও বায়ু শক্তি খাতেও প্রযুক্তি বিনিময় ও বিনিয়োগ সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।
প্রযুক্তি, আইসিটি ও ফিনটেক সেবা
প্রযুক্তি ও সেবা খাত ভবিষ্যতে বাংলাদেশ–ব্রাজিল বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি হতে পারে। বাংলাদেশের আইটি ও আউটসোর্সিং সক্ষমতা এবং ব্রাজিলের উদ্ভাবনী ফিনটেক ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য আদর্শ ক্ষেত্র। ডিজিটাল সেবা রপ্তানি, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ফিনটেক বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে উভয় দেশই লাভবান হতে পারে।
বিনিয়োগ ও নীতিগত সুপারিশ
রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীদের জন্য সুপারিশ হলো বাজার গবেষণা জোরদার করা, বাণিজ্য মেলা ও এক্সপোতে অংশগ্রহণ, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগ। নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো মার্কোসুরের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করা, ব্যাংকিং ও এলসি সংক্রান্ত জটিলতা দূর করা, সরাসরি শিপিং ও লজিস্টিক সংযোগ উন্নত করা এবং বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়ন।
উপসংহার
বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। পরিপূরক অর্থনৈতিক শক্তি, ক্রমবর্ধমান পারস্পরিক আগ্রহ এবং দক্ষিণ–দক্ষিণ সহযোগিতার সুযোগ এই সম্পর্ককে বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বে রূপ দিতে পারে। প্রস্তুত পোশাক, কৃষি, ফার্মাসিউটিক্যালস, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে সঠিক কৌশল ও নীতিগত সহায়তা থাকলে বাংলাদেশ–ব্রাজিল বাণিজ্য ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে উঠবে। এটি শুধু দুই দেশের ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদেরই নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করবে।

