ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানি
মোঃ জয়নাল আব্দীন
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (T&IB)
নির্বাহী পরিচালক, অনলাইন ট্রেনিং একাডেমি (OTA)
মহাসচিব, ব্রাজিল–বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (BBCCI)
বাংলাদেশ ও ব্রাজিল উভয় দেশই যখন নিজেদের বাজার ও সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্যকরণে গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক দ্রুতগতিতে নতুন মাত্রা পাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে রপ্তানি প্রায় ১৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়, যা ২০২৩–২৪ অর্থবছরের ১৪৭ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ২৬% বেশি। এটি ২০২১–২২ অর্থবছরের মাত্র ১০৯ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় আরও বড় লাফ, ফলে ব্রাজিল বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল রপ্তানি গন্তব্যগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে। তবে এখনো বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি রয়ে গেছে: বাংলাদেশে ব্রাজিলের রপ্তানি (মূলত চিনি, তুলা, সয়াবিনের মতো কমোডিটি) ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ২.৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানিকে বহুগুণ ছাড়িয়ে গেছে। এই ভারসাম্যহীনতা কমানোর সম্ভাবনা বিবেচনায় উভয় দেশই অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছে যার প্রতিফলন দেখা যায় সাও পাওলোতে ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত “মেড ইন বাংলাদেশ” ট্রেড এক্সপোর মতো উদ্যোগে। ব্রাজিলকে ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ার পথে অগ্রসর বলে ধারণা করা হয়; এই বাস্তবতায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা ব্রাজিলকে একটি আকর্ষণীয় নতুন ফ্রন্টিয়ার মার্কেট হিসেবে দেখছেন, আর ব্রাজিলের আমদানিকারকরাও দক্ষিণ এশিয়ায় একটি “নতুন অর্থনৈতিক জায়ান্ট” হিসেবে বাংলাদেশের সক্ষমতা আবিষ্কার করছেন। এই প্রবন্ধে ২০২৪ সালের প্রেক্ষাপটে ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান সেগমেন্টসমূহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে শীর্ষ দশটি রপ্তানি পণ্য/খাত চিহ্নিত করে তাদের বর্তমান পারফরম্যান্স, ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ এবং বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের রপ্তানিকারক–আমদানিকারক উভয়ের জন্য সুপারিশসহ একটি বিস্তারিত দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক
ব্রাজিলের দিকে বাংলাদেশের মনোযোগ বৃদ্ধি মূলত বৈশ্বিক বাণিজ্য গতিশীলতার ফল। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রধানত উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপকেন্দ্রিক ছিল; তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু বাজারে শুল্কচাপ ও নীতিগত অনিশ্চয়তা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ঢাকা ব্রাজিলের মতো বিকল্প বাজার অনুসন্ধানে আরও সক্রিয় হয়েছে। লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে ব্রাজিল বিশাল ভোক্তা-ভিত্তি ও বহু খাতে শক্তিশালী চাহিদা নিয়ে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় বাজার। কূটনৈতিক সম্পর্কও শক্তিশালী হয়েছে: ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার “নতুন অর্থনৈতিক জায়ান্ট” হিসেবে উল্লেখ করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ২০২৫ সালের জুনে ব্রাজিল–বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (BBCCI) সাও পাওলোতে একটি উচ্চপর্যায়ের এক্সপোর আয়োজন করে, যেখানে লাতিন আমেরিকার ক্রেতাদের সামনে বাংলাদেশি পণ্য প্রদর্শিত হয়। উভয় পক্ষই জোর দিচ্ছে যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে “পারস্পরিক লাভজনক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে” রূপান্তর করাই পরবর্তী লক্ষ্য। তবুও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে—উচ্চ শুল্ক, দীর্ঘ পরিবহনপথ ও মানদণ্ডগত জটিলতা—তবে সহযোগিতার গতি স্পষ্টভাবেই বাড়ছে। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রেক্ষাপটে ব্রাজিলের মতো নতুন বাজার খোঁজা কেবল সুযোগ নয়, বরং টেকসই রপ্তানি প্রবৃদ্ধির জন্য একটি প্রয়োজনীয় কৌশলও বটে।
ব্রাজিলে বাংলাদেশের শীর্ষ রপ্তানি পণ্যসমূহ
দুই দেশের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব অনেক হলেও বাংলাদেশ ব্রাজিলে বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি করে, যার মধ্যে পোশাক (RMG) সবচেয়ে প্রভাবশালী। তবে পোশাকের পাশাপাশি পাট, চামড়া, ওষুধ, সিরামিকসহ অন্যান্য খাতও ধীরে ধীরে অবস্থান তৈরি করছে। নিচে বাংলাদেশ থেকে ব্রাজিলে রপ্তানিকৃত শীর্ষ দশটি পণ্য/খাত (বা ক্যাটাগরি) বিশ্লেষণ করা হলো প্রতিটি খাতের বর্তমান অবস্থা, সম্ভাবনা এবং রপ্তানি বৃদ্ধির করণীয় আলাদা অনুচ্ছেদে তুলে ধরা হয়েছে।
রেডিমেড গার্মেন্টস (RMG)
ব্রাজিলে বাংলাদেশের এক নম্বর রপ্তানি পণ্য হলো পোশাক, যা বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম অ্যাপারেল রপ্তানিকারক হিসেবে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থানকে প্রতিফলিত করে। প্রধান পণ্যের মধ্যে রয়েছে নিট ও ওভেন গার্মেন্টস যেমন জার্সি, পুলওভার, টি-শার্ট, প্যান্ট, শার্ট, স্যুট, জ্যাকেট ইত্যাদি। ২০২২–২৩ সময়ে ব্রাজিলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং টেক্সটাইল ও পোশাক মিলিয়ে বড় অঙ্কের রপ্তানি অর্জিত হয়। ২০২৩–২৪ সময়ে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ব্রাজিলে মোট রপ্তানি প্রায় ১৮৭ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে পোশাকই সবচেয়ে বড় অবদানকারী থাকে। ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অত্যন্ত বড়: ব্রাজিল বছরে বহু বিলিয়ন ডলারের টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল আমদানি করে, ফলে বাংলাদেশের বর্তমান বাজার শেয়ার এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত।
ব্রাজিলের ভোক্তারা প্রতিযোগিতামূলক দামে মানসম্মত পোশাক চান এখানে বাংলাদেশের উৎপাদন দক্ষতা সুবিধা দিতে পারে। রপ্তানি বাড়াতে বাংলাদেশি প্রস্তুতকারকদের পণ্যে বৈচিত্র্য আনা (বেসিক আইটেম ছাড়াও উচ্চমূল্যের ফ্যাশন/অ্যাথলেজার/ওয়ার্কওয়্যার ইত্যাদি), ব্রাজিলের রিটেইল চেইন অনুযায়ী ডিজাইন ও মাপ মানিয়ে নেওয়া এবং ব্রাজিলকেন্দ্রিক ব্র্যান্ডিং জোরদার করা জরুরি।
পাশাপাশি বড় বাধা হলো উচ্চ আমদানি শুল্ক; বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন মারকোসুর/ব্রাজিলের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা শুল্ক ছাড় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, কারণ অনেক পোশাকে উচ্চ শুল্কহার (৩৫% পর্যন্ত) প্রতিযোগিতা সীমিত করে। যদি শুল্ক কমানো যায় এবং নিয়মিত ফ্যাশন এক্সপো/ট্রেড ফেয়ারে সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়, তবে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ব্রাজিলে দ্রুতগতিতে বাড়তে পারে এবং বাজারটি একটি কৌশলগত দীর্ঘমেয়াদি গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
পাট ও পাটজাত পণ্য
পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী “সোনালি আঁশ” এবং পরিবেশবান্ধব উপকরণ হিসেবে বিশ্বব্যাপী এর চাহিদা নতুন করে বাড়ছে। বাংলাদেশ কাঁচা পাট, পাটসুতা, বস্তা, ব্যাগ, মাদুর ও হস্তশিল্পসহ বহুবিধ পাটজাত পণ্য উৎপাদন করে। বর্তমানে ব্রাজিলে বাংলাদেশের মোট রপ্তানিতে পাটজাত পণ্যের অংশ পোশাকের তুলনায় ছোট হলেও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বাস্তব। ব্রাজিল একটি বড় কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি; কফি, কোকো, চিনি, শস্যসহ নানা পণ্যের জন্য প্যাকেজিং সামগ্রীর প্রয়োজন হয়।
প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে জৈব-বিয়োজ্য পাটের ব্যাগ, দড়ি, বস্তা ব্রাজিলের কৃষি ও লজিস্টিক খাতে কার্যকর সমাধান হতে পারে। এছাড়া পরিবেশ সচেতন ভোক্তাদের কাছে পাটের লাইফস্টাইল প্রোডাক্ট যেমন ইকো শপিং ব্যাগ বা হোম ডেকরও আকর্ষণীয় হতে পারে। এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের উচিত পাটের পরিবেশগত সুবিধা, টেকসইতা ও বহুমুখী ব্যবহার ব্রাজিলের ব্যবসায়ীদের কাছে জোরালোভাবে তুলে ধরা, ব্রাজিলের প্যাকেজিং/অ্যাগ্রো-ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কে অংশীদার খোঁজা এবং ট্রেড ফেয়ারে পাটপণ্য প্রদর্শন করা।
সরকারিভাবে “গ্রিন ব্র্যান্ডিং” এবং নির্দিষ্ট পাটপণ্যে শুল্ক ছাড় বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা আদায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। পাটের মতো পণ্য রপ্তানি-বasket বৈচিত্র্যকরণে বড় অবদান রাখতে পারে এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বাস্তব পথও তৈরি করতে পারে।
চামড়া ও ফুটওয়্যার
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বিশেষত জুতা বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত। দেশটির চামড়া শিল্প বহুদিনের, এবং সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে জুতা, ব্যাগ, বেল্ট ও এক্সেসরিজ রপ্তানিতে সক্ষমতা বাড়িয়েছে। তুলনামূলকভাবে কম উৎপাদন খরচ এবং উৎপাদন স্কেল বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশি ফুটওয়্যারের দাম প্রতিযোগিতামূলক। তবে ব্রাজিলের ক্ষেত্রে এই খাতের রপ্তানি এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত, কারণ ব্রাজিল নিজেই বড় চামড়া ও ফুটওয়্যার উৎপাদক দেশ এবং কিছু ক্ষেত্রে শক্তিশালী দেশীয় শিল্প থাকার ফলে প্রতিযোগিতা বেশি। তবুও নির্দিষ্ট সেগমেন্টে সুযোগ আছে যেমন স্বল্পমূল্যের বড়-ভলিউম জুতা, বিশেষায়িত কিছু লেদার গুডস, বা এমন পণ্য যেখানে ব্রাজিলের দেশীয় উৎপাদন পর্যাপ্ত নয়। রপ্তানি বাড়াতে বাংলাদেশি উৎপাদকদের ব্রাজিলের মানদণ্ড, সাইজিং, ডিজাইন পছন্দ এবং পরিবেশগত কমপ্লায়েন্সে উচ্চ মনোযোগ দিতে হবে। ব্রাজিলীয় আমদানিকারক বা ব্র্যান্ডের সঙ্গে পার্টনারশিপ/ডিস্ট্রিবিউশন চুক্তি করতে পারলে বাজারে প্রবেশ সহজ হবে। নীতিগতভাবে শুল্ক কমানো বা ভবিষ্যৎ কোনো ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টে চামড়াজাত পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা প্রতিযোগিতা বাড়াতে সহায়ক হবে। ব্রাজিলে ফুটওয়্যার ও লেদারওয়্যার ফেয়ারে অংশগ্রহণ এবং নিয়মিত বাজার-প্রমোশন কার্যক্রমের মাধ্যমে এই খাত ধীরে ধীরে বড় অবদানকারী হতে পারে।

ফার্মাসিউটিক্যালস (ওষুধ)
গত এক দশকে বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী বহু দেশে জেনেরিক ওষুধ রপ্তানি করে। দেশীয় চাহিদার বড় অংশ পূরণ করার পাশাপাশি বাংলাদেশি ওষুধের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় বিভিন্ন বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ব্রাজিলের বাজারে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে, কারণ ব্রাজিলে প্রবেশে কঠোর রেগুলেটরি অনুমোদন প্রয়োজন এবং ANVISA-এর মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থার মানদণ্ড পূরণ করা বাধ্যতামূলক। বর্তমানে ব্রাজিলে বাংলাদেশের ফার্মা রপ্তানি মোট রপ্তানির ছোট অংশ হলেও সম্ভাবনা অনেক বড়। ২১০ মিলিয়নের বেশি জনসংখ্যার ব্রাজিলের ওষুধ বাজার অত্যন্ত বড়; মানদণ্ড পূরণ করতে পারলে বাংলাদেশ কম দামে উচ্চমানের জেনেরিক ওষুধ সরবরাহ করতে পারে।
রপ্তানি বাড়াতে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর উচিত আন্তর্জাতিক মান (GMP, ডকুমেন্টেশন, ফার্মাকোভিজিল্যান্স ইত্যাদি) শক্তিশালী করা, ব্রাজিলের অনুমোদন প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল ফাইল প্রস্তুত করা এবং ব্রাজিলের ডিস্ট্রিবিউটর/ফার্মা কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। সরকারও সহযোগিতা করতে পারে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা সমঝোতা স্মারক (MoU) করে রেগুলেটরি সহযোগিতা, দ্রুত অনুমোদন কাঠামো বা তথ্য বিনিময় জোরদার করে। ধৈর্য ও কমপ্লায়েন্স-ভিত্তিক কৌশল অবলম্বন করলে ওষুধ খাত ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানি-বasket বৈচিত্র্যকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
প্লাস্টিক পণ্য
বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্প একটি ক্রমবর্ধমান খাত, যা প্যাকেজিং সামগ্রী, গৃহস্থালি সামগ্রী, গার্মেন্টস এক্সেসরিজ (হ্যাঙ্গার, বোতাম), খেলনাসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করে। ব্রাজিলে বাংলাদেশি প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি এখনো সীমিত হলেও ভবিষ্যতে সম্ভাবনা আছে, কারণ ব্রাজিল বড় পরিমাণে ভোক্তা ও শিল্প-উপযোগী প্লাস্টিক পণ্য আমদানি করে। বাংলাদেশি নির্মাতারা স্বল্পমূল্যে গৃহস্থালি সামগ্রী, প্যাকেজিং ফিল্ম, কিছু কনজ্যুমার গুডস সরবরাহ করতে পারে যদি মান ও সেফটি স্ট্যান্ডার্ড নিশ্চিত করা যায়। বিশেষ করে খাদ্য-গ্রেড প্লাস্টিক, শিশু পণ্য বা নির্দিষ্ট শিল্প উপকরণে ব্রাজিলের নিরাপত্তা মান পূরণ করা জরুরি। রপ্তানি বাড়াতে ব্রাজিলের আমদানিকারক/রিটেইলারদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, ট্রেড শোতে নমুনা প্রদর্শন এবং বাজার-ভিত্তিক পণ্য নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। সরকারিভাবে রপ্তানি প্রণোদনা ও শুল্ক আলোচনার মাধ্যমে প্রতিযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে। প্লাস্টিক পণ্য এখনই বড় রপ্তানি-আয়ের উৎস না হলেও এটি বাজার বৈচিত্র্য ও নতুন নীচ মার্কেট তৈরির একটি বাস্তব সুযোগ।
সিরামিক টেবিলওয়্যার ও হোম ডেকর
বাংলাদেশ গত এক দশকে সিরামিক পণ্যের রপ্তানিতে ধীরে ধীরে সক্ষমতা তৈরি করেছে বিশেষ করে টেবিলওয়্যার, টাইলস এবং কিছু হোম ডেকর আইটেমে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় কিছু বাংলাদেশি কোম্পানি মানসম্মত সিরামিক সরবরাহ করে এবং খাতটি “উচ্চ সম্ভাবনাময়” হিসেবে বিবেচিত। ব্রাজিলে বাংলাদেশি সিরামিক রপ্তানি এখনও খুবই কম, তবে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা রয়েছে। ব্রাজিলের রেস্টুরেন্ট, হোটেল, ক্যাটারিং এবং রিটেইল খাতে বড় বাজার আছে; প্রতিযোগিতামূলক দামে মানসম্মত টেবিলওয়্যার সরবরাহ করা গেলে বাংলাদেশ এখানে জায়গা করে নিতে পারে। রপ্তানি বাড়াতে প্রয়োজন ব্রাজিলের মানদণ্ড (যেমন লেড-ফ্রি, ফুড-সেফটি, পণ্যের টেকসইতা) পূরণ করা, ডিজাইন ও ফিনিশিংয়ে স্থানীয় পছন্দ অনুযায়ী কাস্টমাইজেশন করা এবং ব্রাজিলের ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলে অংশীদার তৈরি করা। সাও পাওলো বা রিওতে হাউসওয়্যার/হসপিটালিটি ফেয়ারে অংশগ্রহণ বাজারে দৃশ্যমানতা বাড়াবে। সময়ের সঙ্গে সিরামিক ও হোম ডেকর ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানিতে একটি অর্থবহ নতুন স্তম্ভ হতে পারে।
হোম টেক্সটাইল ও ফ্যাব্রিক
পোশাকের বাইরে বাংলাদেশ হোম টেক্সটাইল যেমন বেডশিট, তোয়ালে, পর্দা, আপহোলস্টারি ফ্যাব্রিক রপ্তানিতেও শক্ত অবস্থানে আছে। ইউরোপে বাংলাদেশের টেরি তোয়ালে ও কটন বেড লিনেনের চাহিদা উল্লেখযোগ্য। ব্রাজিলে এই ক্যাটাগরির রপ্তানি এখনও সীমিত, কারণ দেশীয় টেক্সটাইল শিল্প ও অন্যান্য দেশের প্রতিযোগিতা রয়েছে। তবুও ব্রাজিলের হোটেল, হাসপাতাল, বড় রিটেইল চেইন এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ভলিউমে মানসম্মত বেডিং ও টাওয়েল সরবরাহের সুযোগ আছে। রপ্তানি বাড়াতে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোকে মান নিয়ন্ত্রণ, ডিজাইন অভিযোজন (ব্রাজিলের বেড সাইজ/প্যাটার্ন পছন্দ), এবং কমপ্লায়েন্স (লেবেলিং, উপাদান ঘোষণা, প্যাকেজিং) নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চ শুল্ক এখানে বড় বাধা; ভবিষ্যৎ কোনো ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টে টেক্সটাইল অন্তর্ভুক্ত হলে প্রতিযোগিতা অনেক বাড়বে। এই খাত দীর্ঘমেয়াদি হলেও বাস্তবসম্মত বৈচিত্র্যকরণ সুযোগ সৃষ্টি করে।
হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্প পণ্য
হস্তশিল্প বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতাকে প্রতিনিধিত্ব করে মাটির কাজ, নকশিকাঁথা, পাট/বেতের হ্যান্ডিক্রাফট, ধাতব ও কাঠের ডেকর আইটেমসহ নানা পণ্য এ খাতে পড়ে। ব্রাজিলে বাংলাদেশের হস্তশিল্প রপ্তানি এখনো খুব সীমিত এবং সাধারণত ছোট চালান বা বিশেষায়িত দোকান/ডায়াসপোরা চাহিদাকেন্দ্রিক। তবে সাও পাওলোতে “মেড ইন বাংলাদেশ” এক্সপোর মতো প্ল্যাটফর্মে হস্তশিল্পের উপস্থিতি ব্রাজিলীয় ক্রেতাদের নজরে আনতে সহায়ক হয়েছে। ভবিষ্যতে এই খাত বাড়াতে হলে গুণগত মানের ধারাবাহিকতা, সময়মতো সরবরাহ, এবং গল্পভিত্তিক ব্র্যান্ডিং গুরুত্বপূর্ণ। ছোট উৎপাদকদের স্কেল-আপে সহায়তার জন্য কো-অপারেটিভ মডেল, রপ্তানি ফ্যাসিলিটেশন, এবং ব্রাজিলীয় ক্রেতাদের সঙ্গে বি২বি ম্যাচমেকিং প্রয়োজন। ই-কমার্সও সম্ভাবনাময়; লজিস্টিক সমাধান ও পর্তুগিজ ভাষায় প্রমোশন থাকলে ব্রাজিলের ভোক্তাদের কাছে সরাসরি বিক্রির সুযোগ বাড়তে পারে। ভলিউমে বড় না হলেও এই খাত সম্পর্ক গভীর করে, সংস্কৃতির মাধ্যমে বাজারে আস্থা তৈরি করে এবং কুটিরশিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন আয়-সুযোগ সৃষ্টি করে।
লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও ইলেকট্রনিক্স
বাংলাদেশের রপ্তানি লক্ষ্য কেবল ঐতিহ্যগত খাতে সীমিত নয়; লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক্স খাতেও সক্ষমতা বাড়ছে যেমন বাইসাইকেল ও যন্ত্রাংশ, ছোট মেশিনারি/টুলস, ইলেকট্রিক কেবল, এবং কিছু ভোক্তা ইলেকট্রনিক পণ্য। ব্রাজিলে এই ক্যাটাগরির রপ্তানি এখনো খুব বড় নয়, তবে সম্ভাবনা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিলের শিল্পখাতে বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ ও কম্পোনেন্ট আমদানি হয়; বাংলাদেশের কিছু সাব-সেক্টর যেমন অটোমোটিভ পার্টস (উদাহরণ হিসেবে ওয়্যারিং হারনেস/ইগনিশন ওয়্যারিং সেটের মতো আইটেম), কেবল বা নির্দিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পোনেন্ট ভবিষ্যতে সুযোগ তৈরি করতে পারে যদি মানদণ্ড ও সার্টিফিকেশন পূরণ করা যায়। এই খাতে প্রবেশে টেকনিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড, সেফটি কোড এবং গুণগত স্থায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফলে প্রযুক্তি উন্নয়ন, মানসনদ (ISO ইত্যাদি) এবং দক্ষতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে ব্রাজিলীয় বাজার জ্ঞান ও বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা একত্র হলে এই খাত বাণিজ্য সম্পর্ককে উচ্চ-মূল্য সংযোজনের পথে এগিয়ে নিতে পারে।
কৃষি–খাদ্য ও মৎস্যজাত পণ্য
এখনো শীর্ষ রপ্তানি আয়ের তালিকায় না থাকলেও ব্রাজিলে বাংলাদেশের কৃষি–খাদ্য ও মৎস্যজাত পণ্যের কিছু নীচ সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশ চা, মাছ (বিশেষ করে চিংড়ি/কাঁকড়া), মসলা, শুকনো খাদ্য ও কিছু প্রক্রিয়াজাত খাবার রপ্তানি করে থাকে, যদিও ব্রাজিলে এর পরিমাণ খুব কম। তবে উচ্চমানের ফ্রোজেন সিফুড (যেমন ব্ল্যাক টাইগার শ্রিম্প) ব্রাজিলের হোটেল–রেস্টুরেন্ট বা বিশেষায়িত আমদানিকারকের কাছে সম্ভাবনাময় হতে পারে। একইভাবে ডায়াসপোরা ও এথনিক মার্কেট চ্যানেলে কিছু খাদ্যপণ্য প্রবেশ করতে পারে। রপ্তানি বাড়াতে ব্রাজিলের স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি মান (SPS), স্বাস্থ্যসনদ, লেবেলিং ও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ম কঠোরভাবে মানতে হবে। দীর্ঘ শিপিং টাইম বিবেচনায় কোল্ড-চেইন ও প্যাকেজিং ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারিভাবে SPS আলোচনা ও সার্টিফিকেশন সহজীকরণ, আর বেসরকারিভাবে ব্রাজিলে বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট/গ্রোসারি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠা এই খাতের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে পারে। ভলিউমে বড় না হলেও এই খাত বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনে এবং সাংস্কৃতিক সংযোগও বৃদ্ধি করে।
ব্রাজিলে রপ্তানি সম্প্রসারণে চ্যালেঞ্জসমূহ
ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানি দ্রুত বাড়লেও ভলিউম আরও বৃদ্ধি ও পণ্য বৈচিত্র্যকরণে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ আছে। সবচেয়ে বড় বাধা হলো উচ্চ শুল্ক ও বাজার প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা। ব্রাজিল (মারকোসুর কাঠামোর অধীনে) বহু পণ্যে উল্লেখযোগ্য আমদানি শুল্ক আরোপ করে উদাহরণ হিসেবে পোশাকে ৩৫% পর্যন্ত উচ্চ শুল্কহার বাংলাদেশের মূল্য প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের মধ্যে বর্তমানে কার্যকর কোনো অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি না থাকায় অধিকাংশ পণ্যকে পূর্ণ MFN শুল্ক দিয়েই প্রবেশ করতে হয়। শুল্কের পাশাপাশি নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার ও রেগুলেটরি জটিলতাও বড় সমস্যা। ব্রাজিলে পণ্যের মানদণ্ড কঠোর; ওষুধে ANVISA অনুমোদন, খাদ্যে SPS শর্ত, ভোক্তা পণ্যে নিরাপত্তা মান, পর্তুগিজ ভাষায় লেবেলিং এসব পূরণ করা নতুন রপ্তানিকারকদের জন্য সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
লজিস্টিক দিক থেকেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে: ভৌগোলিক দূরত্ব অত্যন্ত বেশি, সরাসরি শিপিং রুট সীমিত, ট্রান্সশিপমেন্টের কারণে ট্রানজিট টাইম দীর্ঘ হয় (সমুদ্রপথে প্রায়ই এক মাস বা তারও বেশি), ফলে শিপিং খরচ ও ঝুঁকি বাড়ে বিশেষ করে নষ্টপ্রবণ পণ্যে। ব্যবসায়িক যোগাযোগের জন্য সরাসরি ফ্লাইট সংযোগ সীমিত হওয়ায় ভিজিট, স্যাম্পল ডেলিভারি, জরুরি আলোচনায়ও সময় ও খরচ বাড়ে।
আরেকটি বড় বাধা হলো তথ্য, ভাষা ও নেটওয়ার্ক ঘাটতি। লাতিন আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলকভাবে অপরিচিত বাজার ছিল; ব্রাজিলে ব্যবসা করতে পর্তুগিজ ভাষা, স্থানীয় ব্যবসায়িক রীতি, ডিস্ট্রিবিউশন কাঠামো বোঝা জরুরি। অনেক বাংলাদেশি কোম্পানির ব্রাজিলে লোকাল প্রতিনিধি নেই, ফলে ব্রাজিলীয় আমদানিকারকদের সঙ্গে আস্থা ও ধারাবাহিক যোগাযোগ তৈরি কঠিন হয়।
প্রতিযোগিতাও কম নয়। পোশাকে চীন–ভিয়েতনামসহ অন্যান্য বড় সরবরাহকারী আছে; ফুটওয়্যারে ব্রাজিলের নিজস্ব শক্তিশালী উৎপাদন; টেক্সটাইল ও হোম গুডসে ভারত–পাকিস্তানসহ বহু দেশের প্রতিযোগিতা। মূল্য, মান ও ডেলিভারি সব দিকেই ধারাবাহিক সক্ষমতা না থাকলে বাজার দখল কঠিন।
সবশেষে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের LDC গ্র্যাজুয়েশন বৈশ্বিক বাজারে কিছু প্রেফারেন্স হারানোর ঝুঁকি তৈরি করছে। ব্রাজিলে বড় কোনো LDC-ভিত্তিক প্রেফারেন্স না থাকলেও সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের জন্য FTAs/PTAs অনুসন্ধান আরও জরুরি হয়ে উঠবে, যাতে ভবিষ্যৎ শুল্কচাপ মোকাবিলা করে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যায়।
সারসংক্ষেপে, চ্যালেঞ্জগুলো কাঠামোগত (শুল্ক, দূরত্ব), প্রাতিষ্ঠানিক (মানদণ্ড/কমপ্লায়েন্স), তথ্যভিত্তিক (বাজার জ্ঞান) এবং প্রতিযোগিতামূলক সব মিলিয়ে জটিল। এগুলো কাটাতে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সুপারিশ ও ভবিষ্যৎ করণীয়
বাংলাদেশ–ব্রাজিল বাণিজ্যের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে উপরোক্ত চ্যালেঞ্জগুলো কৌশলগত উদ্যোগের মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নীতি পর্যায়ের সম্পৃক্ততা। বাংলাদেশ সরকারের উচিত ব্রাজিল বা মারকোসুরের সঙ্গে শুল্ক ছাড়/হ্রাস নিয়ে আলোচনা জোরদার করা এবং সম্ভব হলে একটি PTA বা FTA-এর দিকে অগ্রসর হওয়া। এমনকি নির্বাচিত কিছু পণ্যে সীমিত অগ্রাধিকারমূলক চুক্তিও পোশাক, পাট, সিরামিক বা চামড়ার মতো খাতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ব্রাজিলও নতুন অংশীদারিত্বে আগ্রহ দেখাচ্ছে—এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্রুত দৃশ্যমান ফল আনা দরকার।
দ্বিতীয়ত, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন ও বাজার সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। সাও পাওলোতে “মেড ইন বাংলাদেশ” এক্সপোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করে নিয়মিত ট্রেড ফেয়ার, বি২বি ম্যাচমেকিং, সেক্টরাল সেমিনার, এবং প্রদর্শনী আয়োজন করা উচিত। BBCCI-এর মতো প্ল্যাটফর্ম ব্রাজিলে বাংলাদেশি পণ্যের স্থায়ী দৃশ্যমানতা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে; স্থায়ী শোরুম/ট্রেড সেন্টার চালু হলে বছরজুড়ে আমদানিকারকদের সঙ্গে সংযোগ সহজ হবে। যৌথ বিজনেস কাউন্সিল বা ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করে কাস্টমস, সার্টিফিকেশন, লজিস্টিক, পেমেন্ট টার্মস ইত্যাদি সমস্যা নিয়মিত সমাধান করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, লজিস্টিক দক্ষতা বাড়াতে উদ্যোগ প্রয়োজন। সরাসরি শিপিং রুটের সম্ভাব্যতা, ট্রান্সশিপমেন্ট হাব অপ্টিমাইজেশন, কনসোলিডেশন ব্যবস্থা, এবং উচ্চ-মূল্য/সময়-সংবেদনশীল পণ্যে এয়ার কার্গো অপশন উন্নয়নের চিন্তা করা যেতে পারে।
রপ্তানিকারকদের জন্য করণীয় হলো বাজার গবেষণা ও অভিযোজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া: পর্তুগিজ ভাষায় ক্যাটালগ/লেবেলিং প্রস্তুত, ব্রাজিলীয় ভোক্তার পছন্দ অনুযায়ী ডিজাইন/প্যাকেজিং বদল, মানদণ্ড ও ডকুমেন্টেশনে কঠোরতা, এবং স্থানীয় এজেন্ট/ডিস্ট্রিবিউটরের সঙ্গে চুক্তি করা। যৌথ উদ্যোগ বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে—ব্রাজিলীয় কোম্পানি বাজার জ্ঞান ও ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক দিতে পারে, বাংলাদেশ দিতে পারে প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন সক্ষমতা। এছাড়া ব্রাজিলে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি (যদিও সংখ্যায় সীমিত) এথনিক মার্কেট, রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে কিছু খাতে আমদানির নতুন চ্যানেল তৈরি করতে পারে।
ব্রাজিলীয় আমদানিকারকদের জন্য সুপারিশ হলো উৎস বৈচিত্র্যকরণ ও সক্রিয় সোর্সিং। চীন/আঞ্চলিক সরবরাহকারীর বাইরে বাংলাদেশি সরবরাহকারী খুঁজলে মূল্য ও বিকল্প পণ্যে সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। ব্রাজিলীয় ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের কারখানা ও শিল্পাঞ্চল পরিদর্শন করলে আস্থা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদি সাপ্লাই চেইন অংশীদারত্ব তৈরি হবে। ব্রাজিল চাইলে ঢাকায় ট্রেড রিপ্রেজেন্টেশন/সহায়তা সেল বাড়াতে পারে, যা ম্যাচমেকিং ত্বরান্বিত করবে।
সবশেষে, বাংলাদেশ সরকারের সহায়তা রপ্তানি প্রণোদনা, SME-দের বিদেশি ফেয়ারে অংশগ্রহণে সহায়তা, এবং লাতিন আমেরিকা-কেন্দ্রিক কমপ্লায়েন্স/রেগুলেশন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। ব্রাজিলে প্রবেশের জন্য বিশেষায়িত গাইডলাইন, পরামর্শ সেবা, এবং পর্তুগিজ ভাষায় ডকুমেন্টেশন সহায়তাও কার্যকর হবে।
উপসংহারে, ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানি যাত্রা এখনো বিকাশমান হলেও প্রবৃদ্ধির ধারা শক্তিশালী। বাংলাদেশের উৎপাদিত শিল্পপণ্য ও ব্রাজিলের কমোডিটি-ভিত্তিক রপ্তানি এই পরিপূরক কাঠামো পারস্পরিক লাভজনক বাণিজ্যের ভিত্তি তৈরি করে। লক্ষ্যভিত্তিক নীতিগত উদ্যোগ, সক্রিয় ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা এবং কমপ্লায়েন্স-ভিত্তিক বাজার প্রবেশ কৌশল গ্রহণ করলে বাংলাদেশ ব্রাজিলে রপ্তানি ভলিউম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে এবং রপ্তানি-বৈচিত্র্যকরণে বড় অগ্রগতি অর্জন করতে পারে। এতে বাণিজ্য ঘাটতি কমবে, দুদেশের অর্থনৈতিক সংযোগও দৃঢ় হবে। ২০২৪ ও পরবর্তী সময়ে পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, পাট, সিরামিক, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যসহ নতুন নতুন নীচ সেগমেন্টে উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশ–ব্রাজিল বাণিজ্য দক্ষিণ–দক্ষিণ সহযোগিতার একটি কার্যকর উদাহরণে পরিণত হতে পারে যা উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা-শক্তি ও যৌথ সমৃদ্ধির ভিত্তিতে এগিয়ে যাবে।

