ব্রাজিল থেকে বাংলাদেশে চিনি আমদানি: বাংলাদেশি আমদানিকারকদের জন্য একটি ব্যবহারিক গাইড (২০২৬)

ব্রাজিল থেকে বাংলাদেশে চিনি আমদানি: বাংলাদেশি আমদানিকারকদের জন্য একটি ব্যবহারিক গাইড (২০২৬)

 

মোঃ জয়নাল আব্দীন
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ
সম্পাদক, টিএন্ডআইবি বিজনেস ডিরেক্টরি; নির্বাহী পরিচালক, অনলাইন ট্রেনিং একাডেমি
মহাসচিব, ব্রাজিল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি

 

ব্রাজিল বিশ্বে অন্যতম বৃহৎ ও নিরবচ্ছিন্ন চিনি রপ্তানিকারক দেশ। দেশটিতে সুসংগঠিত রপ্তানি লজিস্টিকস, বাল্ক ও কনটেইনার—উভয় ধরনের শিপমেন্ট সুবিধা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গ্রেড যেমন VHP কাঁচা চিনি ও পরিশোধিত সাদা চিনি (ICUMSA রঙ গ্রেড 45, 150 ইত্যাদি) সহজলভ্য। সান্তোস ও পারানাগুয়া মতো প্রধান বন্দরগুলো উচ্চমাত্রার কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য সুসজ্জিত। বাংলাদেশি আমদানিকারকদের জন্য ব্রাজিল আকর্ষণীয় কারণ হলো (ক) বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য পাওয়া যায়, (খ) বড় ও ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, এবং (গ) স্থানীয় রিফাইনারি ও ভোক্তা বাজারে ব্যবহারের জন্য মানসম্মত গ্রেড সহজে পাওয়া যায়।

 

২) আপনি ঠিক কী আমদানি করছেন তা বোঝা জরুরি: কাঁচা চিনি বনাম পরিশোধিত চিনি (এতে আপনার পরিকল্পনা কীভাবে বদলায়)

আপনার পুরো আমদানি পরিকল্পনা সরবরাহকারী নির্বাচন, পরিদর্শন পদ্ধতি, প্যাকেজিং, জাহাজের ধরন, বন্দর হ্যান্ডলিং এবং এমনকি লক্ষ্য ক্রেতা সবকিছুই চিনির গ্রেডের ওপর নির্ভর করে।

 

ক) কাঁচা চিনি (স্থানীয় রিফাইনারির জন্য সাধারণত ব্যবহৃত)
সাধারণত VHP (Very High Polarization) কাঁচা চিনি হিসেবে লেনদেন হয়। এটি প্রায়শই বড় আকারের বাল্ক শিপমেন্টে পরিবহন করা হয়, যাতে প্রতি টনের পরিবহন খরচ কমে। চূড়ান্ত পণ্যের গুণগত মান অনেকটাই নির্ভর করে স্থানীয় রিফাইনারির সক্ষমতা ও প্রসেসিং লসের ওপর।

 

খ) পরিশোধিত সাদা চিনি (সরাসরি ভোক্তা ব্যবহার বা প্যাকেটজাতকরণের জন্য)
সাধারণত ICUMSA 45 (অত্যন্ত সাদা) বা বাজারভেদে ICUMSA 150 ইত্যাদি গ্রেড হিসেবে আমদানি করা হয়। ৫০ কেজি ব্যাগে কনটেইনারের মাধ্যমে বা কখনো কখনো ব্রেক-বাল্ক আকারে পরিবহন করা হয়, যা পরিমাণ ও বন্দর সুবিধার ওপর নির্ভরশীল।

 

আমদানিকারকদের জন্য পরামর্শ: আপনি যদি নিজে রিফাইনারি না হন, তাহলে পরিশোধিত চিনি আমদানি করা তুলনামূলক সহজ, তবে প্যাকেজিংয়ের অখণ্ডতা, লেবেলিং ও মান নিয়ন্ত্রণে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

 

৩) বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রক সম্মতি: যেগুলো উপেক্ষা করা যাবে না

চিনি একটি খাদ্যপণ্য। তাই বাংলাদেশে চিনি আমদানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সকল খাদ্য ও মানসংক্রান্ত বিধিবিধান মেনে চলা বাধ্যতামূলক। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশ ট্রেড পোর্টাল অনুযায়ী, চিনি আমদানির ক্ষেত্রে BSTI-এর কনফরমিটি স্ট্যান্ডার্ডস সার্টিফিকেট প্রয়োজন হতে পারে। বাস্তবে, অনেক আমদানিকারক গন্তব্য বন্দরে মান যাচাই ও কখনো কখনো প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশনও করে থাকেন, কারণ মানসংক্রান্ত কোনো জটিলতা হলে বন্দর জট, ডেমারেজ, অতিরিক্ত গুদাম খরচ বা এমনকি পণ্য প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি থাকে।

 

এছাড়া, বাংলাদেশে চিনির ওপর শুল্ক ও কর কাঠামো নির্ধারিত রয়েছে HS চ্যাপ্টার ১৭-এর আওতায় (বিশেষ করে HS 1701)। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) কাস্টমস ট্যারিফ FY ২০২৫-২০২৬ অনুযায়ী 170112, 170113, 170114, 170191, 170199 ইত্যাদি HS কোডে শুল্ক, ভ্যাট, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ও অন্যান্য কর নির্ধারিত আছে।

গুরুত্বপূর্ণ: শুল্ক ও কর হার SRO বা নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই এলসি খোলার আগে অবশ্যই আপনার সিএন্ডএফ এজেন্টের মাধ্যমে হালনাগাদ শুল্ক-কর নিশ্চিত করা জরুরি।

 

৪) কেনার আগে বাণিজ্যিক পরিকল্পনা: যা আপনার লাভের মার্জিন রক্ষা করবে

ব্রাজিল থেকে কোটেশন নেওয়ার আগে নিচের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।

 

ক) লক্ষ্য বাজার ক্রেতা
আপনি কি রিফাইনারির জন্য কাঁচা চিনি আনছেন, নাকি প্যাকেটজাত বা খুচরা বাজারের জন্য পরিশোধিত চিনি? গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড নির্ধারণ করুন রঙ, আর্দ্রতা, পোলারাইজেশন, অদ্রবণীয় পদার্থ ও দূষণ সীমা।

 

খ) শিপমেন্টের আকার পরিবহন কৌশল
বাল্ক শিপমেন্ট বড় পরিমাণে সবচেয়ে কম খরচে কার্যকর। কনটেইনার শিপমেন্ট ছোট ও মাঝারি পরিমাণের জন্য সুবিধাজনক, তবে প্রতি টনের খরচ তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

 

গ) মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি
ভাসমান আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্কের ওপর ভিত্তি করে কিনবেন নাকি নির্দিষ্ট মূল্য ঠিক করবেন তা নির্ধারণ করুন। মূল্য গণনায় অন্তর্ভুক্ত করুন পণ্যমূল্য, গ্রেড অনুযায়ী প্রিমিয়াম বা ডিসকাউন্ট, পরিবহন, বীমা, ব্যাংক চার্জ, বন্দর খরচ, শুল্ক-কর ও অভ্যন্তরীণ পরিবহন।

 

ঘ) সময় মৌসুমী বিবেচনা
বিশ্ব চিনির বাজার অস্থির হতে পারে। জাহাজের সময়সূচি পরিবর্তন, বন্দর জট ও ডকুমেন্টারি বিলম্বের জন্য পর্যাপ্ত বাফার রাখুন।

ব্রাজিল থেকে বাংলাদেশে চিনি আমদানি: বাংলাদেশি আমদানিকারকদের জন্য একটি ব্যবহারিক গাইড (২০২৬)
ব্রাজিল–মার্কোসুর বাণিজ্য চুক্তি: বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

৫) ধাপে-ধাপে প্রক্রিয়া: কীভাবে ব্রাজিল থেকে বাংলাদেশে চিনি আমদানি করবেন

ধাপ ১: আমদানির প্রস্তুতি (বাংলাদেশ অংশ)

আপনার থাকতে হবে বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংকিং সুবিধা ও আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় নিবন্ধন। একজন অভিজ্ঞ সিএন্ডএফ এজেন্ট, যিনি HS কোড, বন্দর প্রক্রিয়া ও ল্যান্ডেড কস্ট নিরূপণে সহায়তা করবেন।

 

ধাপ ২: পণ্যের স্পেসিফিকেশন ও HS কোড নির্ধারণ

আপনার সিএন্ডএফ এজেন্টের সহায়তায় HS 1701-এর আওতায় সঠিক কোড নির্ধারণ করুন এবং কন্ট্রাক্টে পণ্যের স্পেসিফিকেশন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন।

 

ধাপ ৩: ব্রাজিলিয়ান সরবরাহকারী নির্বাচন কোটেশন গ্রহণ

প্রফর্মা ইনভয়েসে অন্তর্ভুক্ত থাকুক পণ্যের গ্রেড ও মান, পরিমাণ ও প্যাকেজিং, ইনকোটার্মস (FOB/CFR/CIF), শিপমেন্ট সময়সূচি, পেমেন্ট টার্মস এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টের তালিকা।

 

ধাপ ৪: সরবরাহকারী যাচাই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ

মূল্যের পাশাপাশি সরবরাহকারীর বিশ্বাসযোগ্যতা, গুণগত মান নিশ্চিতকরণ ধারা, জরিমানা ও বিরোধ নিষ্পত্তি ধারা কন্ট্রাক্টে যুক্ত করুন।

 

ধাপ ৫: পরিদর্শন ব্যবস্থা নির্ধারণ

প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন, লোড পোর্ট সুপারভিশন এবং গন্তব্য বন্দরে মান পরীক্ষা—যেকোনো একটি বা একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।

 

ধাপ ৬: অর্থায়ন এলসি খোলা

এলসির শর্তাবলি বাস্তবসম্মত রাখুন এবং ডকুমেন্টারি অসামঞ্জস্য এড়াতে সরবরাহকারীর সক্ষমতার সঙ্গে মিলিয়ে নিন।

 

ধাপ ৭: শিপিং লজিস্টিকস নিশ্চিতকরণ

লোড পোর্ট, ডিসচার্জ পোর্ট, কনটেইনার বা বাল্ক জাহাজ নির্বাচন, স্টোরেজ পরিকল্পনা ও ডেমারেজ বাজেট নির্ধারণ করুন।

 

ধাপ ৮: পূর্ণ ডকুমেন্ট সেট প্রস্তুত

কমার্শিয়াল ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, বিল অব লেডিং, সার্টিফিকেট অব অরিজিন, কোয়ালিটি ও ওজন সার্টিফিকেট, বীমা ডকুমেন্ট ইত্যাদি নিশ্চিত করুন।

 

ধাপ ৯: বাংলাদেশে আগমন কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স

ম্যানিফেস্ট, HS কোড যাচাই, শুল্ক-কর পরিশোধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পণ্য ছাড়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন।

 

ধাপ ১০: BSTI কনফরমিটি মান অনুমোদন

স্যাম্পলিং, ল্যাব টেস্টিং ও পণ্য মুক্তির জন্য আগাম পরিকল্পনা রাখুন, যাতে ডেমারেজ কমে।

 

ধাপ ১১: অভ্যন্তরীণ পরিবহন বিতরণ

পরিশোধিত চিনির ক্ষেত্রে আর্দ্রতা ও ব্যাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করুন। কাঁচা চিনির ক্ষেত্রে দ্রুত ডিসচার্জ ও রিফাইনারিতে পরিবহন করুন।

 

৬) খরচ ও মূল্য নির্ধারণ: বাস্তবসম্মত ল্যান্ডেড কস্ট মডেল তৈরি করুন

একটি সঠিক কস্ট মডেলে অন্তর্ভুক্ত থাকবে—পণ্যমূল্য, পরিবহন, বীমা, ব্যাংক চার্জ, বন্দর খরচ, শুল্ক-কর, অভ্যন্তরীণ পরিবহন, ক্ষয়ক্ষতি ও ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল খরচ।

 

৭) ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: বাংলাদেশি আমদানিকারকদের সাধারণ ভুল

শুধু কম দামে কেনা, দুর্বল এলসি শর্ত, ভুল HS কোড, BSTI প্রক্রিয়ার প্রস্তুতির অভাব এবং প্যাকেজিং সুরক্ষার ঘাটতি এই ভুলগুলো এড়াতে হবে।

 

৮) ব্যবহারিক চেকলিস্ট (প্রতিটি শিপমেন্টের জন্য অনুসরণযোগ্য)

  • পণ্যের ধরন নিশ্চিত করুন।
  • সঠিক HS কোড ও হালনাগাদ শুল্ক-কর যাচাই করুন।
  • সরবরাহকারী ও পরিদর্শন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করুন।
  • বাস্তবসম্মত এলসি খুলুন।
  • শিপিং ও ডকুমেন্টেশন সম্পূর্ণ করুন।
  • BSTI প্রক্রিয়া আগেই পরিকল্পনা করুন।
  • কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও বিতরণ নির্বিঘ্ন করুন।

 

সমাপনী মন্তব্য

ব্রাজিল থেকে বাংলাদেশে চিনি আমদানি লাভজনক হতে পারে, যদি এটি একটি নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত প্রক্রিয়া হিসেবে পরিচালনা করা হয়। সঠিক পণ্য নির্বাচন, HS কোডের যথার্থতা, শক্ত কন্ট্রাক্ট ও পরিদর্শন ব্যবস্থা, নির্ভুল ডকুমেন্টেশন এবং BSTI কনফরমিটি পরিকল্পনাই দীর্ঘমেয়াদে সফল আমদানির মূল চাবিকাঠি।